বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম যখন কয়েক দিন ধরে নিম্নমুখী, ঠিক সেই সময়েই বাংলাদেশে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বেড়ে যথাক্রমে ১৩৫, ১৫৫, ১৬০ ও ১৬৫ টাকা হয়েছে। নতুন মূল্য ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
এটি দেশের জ্বালানি তেলের খুচরা দামের ক্ষেত্রে নতুন সর্বোচ্চ পর্যায়। তবে এককালীন বৃদ্ধির বিচারে ২০২২ সালের আগস্টের সমন্বয় আরও বড় ছিল।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার প্রবণতা থাকলে বাংলাদেশের বাজারে একই সময়ে দাম বাড়ানোর কারণ কী?
আন্তর্জাতিক বাজারে তখন কী ঘটছিল?
২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিভিন্ন বাজার প্রতিবেদনে ওই সময় ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ফিউচারের দাম কয়েক দিনের ধারাবাহিক পতনের মধ্যে ছিল। একটি বাজার প্রতিবেদনে ব্রেন্টের দাম প্রায় ১০১.৭১ ডলার এবং WTI প্রায় ৯৮.১৫ ডলারে নেমে আসার কথা বলা হয়।
অন্যদিকে, একই সময়ে সরকারের যুক্তি ছিল ভিন্ন। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলেছে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের দাম, পরিবহন ও অন্যান্য আমদানি-সংক্রান্ত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আরও পড়ুনঃ তারেক রহমানের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের একটি দিনের বা কয়েক দিনের দরপতন এবং বাংলাদেশের খুচরা মূল্য নির্ধারণের হিসাব—দুটিকে সরাসরি এক করে দেখা যায় না। কারণ বাংলাদেশের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের নির্দিষ্ট সময়ের গড়মূল্য, বিনিময় হার, শুল্ক-কর, পরিবহন ব্যয়, বিপিসির মার্জিনসহ বিভিন্ন উপাদান বিবেচনা করা হয়।
তবে এখানেই স্বচ্ছতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
‘স্বয়ংক্রিয়’ মূল্য নির্ধারণ কতটা স্বচ্ছ?
বাংলাদেশে ২০২৪ সাল থেকে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত সমন্বয়ের জন্য স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করা হয়। নির্ধারিত কাঠামোয় আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক-কর, পরিবহন ব্যয় এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মার্জিনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করার কথা রয়েছে।
কিন্তু সাধারণ ভোক্তার কাছে প্রশ্ন থেকে যায়—কোন সময়ের আন্তর্জাতিক বাজারদর গড় হিসেবে নেওয়া হলো, কোন সময়ের বিনিময় হার ব্যবহার করা হলো, আমদানি ও পরিবহন ব্যয়ের হিসাব কত, আর প্রতি লিটারে প্রকৃত আমদানি ব্যয়ই বা কত?
আরও পড়ুনঃ নরউইচে বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের নির্বাচনী প্রচারণা
এসব উপাত্ত যদি নিয়মিত ও সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ না করা হয়, তাহলে ‘স্বয়ংক্রিয়’ ব্যবস্থাও সাধারণ মানুষের কাছে একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে।
অতএব, শুধু মূল্য ঘোষণা নয়—মূল্য নির্ধারণের হিসাবটিও প্রকাশ্য হওয়া প্রয়োজন।
সরকারের ব্যাখ্যা কী?
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। সরকারের হিসাবে, সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের আগে ডিজেল বিক্রিতে প্রতি লিটারে বিপিসির প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছিল। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
সরকার আরও বলেছে, দেশের তুলনামূলক কম জ্বালানি মূল্যের কারণে সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা জ্বালানির মূল্য ও বিপিসির আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সরকারি ব্যাখ্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সর্বশেষ ২০ টাকা বৃদ্ধির পরও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম প্রতিবেশী ও এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম রয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
দাম বাড়ার প্রভাব কোথায় গিয়ে পড়ে?
জ্বালানি তেলের দাম শুধু পাম্পের মূল্য নয়; এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ডিজেল পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন, গণপরিবহন, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পর এর প্রভাব ইতোমধ্যে পণ্য পরিবহন ও ব্যবসায়িক ব্যয়ের ওপর পড়তে শুরু করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ একটি লিটার ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত শুধু একজন গাড়িচালক বা কৃষকের ব্যয় বাড়ায় না; এর প্রভাব বাজারের বিভিন্ন স্তর ঘুরে সাধারণ ভোক্তার ব্যয়েও পৌঁছাতে পারে।
আঞ্চলিক দামের তুলনা কতটা কার্যকর?
জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে বিতর্কে প্রতিবেশী দেশগুলোর দাম প্রায়ই তুলনা হিসেবে সামনে আসে। বাংলাদেশের তুলনামূলক কম দাম থাকলে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—সরকারের বক্তব্যে এ বিষয়টি এসেছে।
তবে শুধু প্রতিবেশী দেশের বর্তমান দাম দেখেই কোনো দেশের জ্বালানি মূল্যনীতি বিচার করা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি দেশের কর কাঠামো, ভর্তুকি, আমদানি নির্ভরতা, মুদ্রার বিনিময় হার, শোধনাগার সক্ষমতা এবং জ্বালানি ব্যবহারের ধরন আলাদা।
তাই আঞ্চলিক তুলনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন একই সময়ে একই ধরনের উপাত্ত ও একই পদ্ধতিতে দেশগুলোর মূল্য বিশ্লেষণ করা হবে।
সংসদীয় ও জনসম্পৃক্ত পর্যালোচনার প্রশ্ন
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে প্রভাবিত করে। তাই শুধু প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণের সূত্র, ব্যবহৃত উপাত্ত এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক হিসাব জনসম্মুখে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞ, ভোক্তা প্রতিনিধি, পরিবহন খাত, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং অর্থনীতিবিদদের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে মূল্য সমন্বয়ের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করা যেতে পারে।
বিশেষ করে কোন আন্তর্জাতিক বাজারদর, কোন সময়ের গড়, কোন বিনিময় হার এবং কোন আমদানি ব্যয়ের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হলো—এই তথ্যগুলো নিয়মিত প্রকাশ করা হলে সরকারের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জনসাধারণের বোঝাপড়া বাড়বে।
সামনে বড় প্রশ্ন
বাংলাদেশের জ্বালানি মূল্যনীতির মূল চ্যালেঞ্জ শুধু দাম বাড়ানো বা কমানো নয়। বড় প্রশ্ন হলো—মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি কতটা স্বচ্ছ, সময়োপযোগী এবং যাচাইযোগ্য।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশে আসা স্বাভাবিক। একইভাবে বিশ্ববাজারে দীর্ঘস্থায়ী দরপতন হলে তার সুফল কীভাবে এবং কত দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে—সেটিও মূল্যনীতির অংশ হওয়া প্রয়োজন।
সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারের সামনে একদিকে বিপিসির আর্থিক চাপ, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার ও পাচারের ঝুঁকি; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ—দুই দিকই বিবেচনার বিষয়।
তাই জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে বিতর্ককে শুধু ‘দাম বাড়ানো যৌক্তিক কি না’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে মূল্য নির্ধারণের সূত্র, ব্যবহৃত তথ্য, আর্থিক ব্যয় ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তরও প্রকাশ করা জরুরি।
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা তখনই কার্যকর ও জনগ্রহণযোগ্য হবে, যখন এর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্যভাবে প্রকাশিত হবে এবং বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয়ের যুক্তিও স্পষ্ট থাকবে।





