প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ যেন কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক আইনে পরিণত না হয় এবং সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের কেউ যাতে এর অপপ্রয়োগের শিকার না হন, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সাইবার সুরক্ষা আইন
তিনি বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেই আইনটির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে।
আজ বাংলাদেশ সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনদের নিয়ে আয়োজিত পরামর্শ সভা শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সভায় ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট সংশোধনের লক্ষ্যে তৈরি খসড়া বিলটি এর আগে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। মন্ত্রিসভার নির্দেশনা অনুযায়ী সাইবার স্পেসে কর্মরত আইটি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা ও পরামর্শের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইনটি যাতে কোনো ধরনের নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে লক্ষ্যেই খসড়া বিলটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষার্থী ও সাইবার স্পেস ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মতামত পাওয়া গেছে এবং সেগুলো সরকার সংকলন করেছে।
সাংবাদিকদের মতামত ও সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদক, প্রতিনিধি, সাংবাদিক সংগঠন এবং পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে এটি সরকারের দ্বিতীয় পরামর্শ সভা। এর আগে ১০ সেপ্টেম্বর সম্পাদকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রথম সভায় পরবর্তী বৈঠকে লিখিত মতামত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
তিনি জানান, আজকের সভায় অনেকেই তাঁদের মতামত তুলে ধরেছেন এবং লিখিত সুপারিশ দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
সভায় ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহবুব আনামের একটি প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আরও সময় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যম যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং আইনে প্রয়োজনীয় ‘সেভিং ক্লজ’ বা সুরক্ষা বিধান রাখা হয়, সেই প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সরকার ওই প্রস্তাব গ্রহণ করেছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য সরকারের নেই। কোনো সাংবাদিক যাতে আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হন, সেটিই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
সাংবাদিক গ্রেপ্তারে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এসেছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বা তাকে গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।
সরকার এই প্রস্তাবকে উপযুক্ত ও যুক্তিসংগত মনে করছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অংশীজনদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক সুপারিশ পাওয়ার পর বিষয়টি বিলের খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ ছাড়া মামলা বা আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের বিধান রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশ
খসড়া আইন চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় সমন্বয়ের জন্য প্রধান তথ্য কর্মকর্তাকে (পিআইও) ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় যৌথভাবে পুরো প্রক্রিয়া সমন্বয় করবে।
এ প্রক্রিয়ায় সম্পাদক পরিষদ, ইলেকট্রনিক মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশন এবং আইটি মন্ত্রণালয়ের গঠিত সাইবার বিশেষজ্ঞদের প্যানেলের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। আগামী ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তাঁদের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কমিটির সদস্যরা বৈঠকে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
সংশোধিত খসড়া আবারও প্রকাশ করা হবে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অংশীজনদের সুপারিশের ভিত্তিতে সংশোধিত খসড়া তৈরির পর সেটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের আগে আবারও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা পুনরায় মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রাপ্ত মতামত গ্রহণযোগ্য হলে তা খসড়ায় সংযুক্ত করা হবে। এরপর নিয়ম অনুযায়ী আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পর্যালোচনার পর বিলটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে। তবে সংসদে উপস্থাপনের পরও তাড়াহুড়ো করে এটি পাস করা হবে না বলে জানান মন্ত্রী। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের আলোচনা ছাড়াও সংসদের বাইরে বিভিন্ন সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে পাওয়া মতামত বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানান তিনি।
সাইবার অপরাধ থেকে সুরক্ষাই মূল লক্ষ্য
প্রস্তাবিত আইনের উদ্দেশ্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন করতে চায়, যার মাধ্যমে দেশ, সমাজ এবং বিশেষ করে তরুণদের সাইবার স্পেসে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারিবারিক বন্ধন এবং দেশীয় সংস্কৃতির সুরক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।





