বোয়িং-জে-১০সিইর পাশাপাশি এয়ারবাস: বাংলাদেশের কৌশল কি বহুমুখী ভারসাম্য?

বোয়িং-জে-১০সিইর পাশাপাশি এয়ারবাস: বাংলাদেশের কৌশল কি বহুমুখী ভারসাম্য?
জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কিনতে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের বিমান ও প্রতিরক্ষা খাতে সাম্প্রতিক কয়েকটি সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ এবং চীনের তৈরি J-10CE যুদ্ধবিমান সংগ্রহের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে; অন্যদিকে ইউরোপীয় বিমান নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকেও উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে ঢাকার আগ্রহ প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে বাংলাদেশের ক্রয়নীতি ও কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

চীনের কাছ থেকে J-10CE যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান জানিয়েছেন, যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার কেনার জন্য একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে মোট কতটি বিমান, চূড়ান্ত মূল্য ও সরবরাহের সময়সূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তির আগে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে বেসামরিক বিমান চলাচলে বাংলাদেশ বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসকেও বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ১০টি এয়ারবাস কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত বহরে চারটি A350-900 এবং ছয়টি A321neo উড়োজাহাজ রাখার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে সম্প্রতি ঢাকায় এক আলোচনায় বাংলাদেশের বিমান ক্রয়প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এয়ারবাসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশীদারিত্বকে শুধু একটি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি বাংলাদেশ-ইউরোপ সহযোগিতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এর আগে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই নির্মাতার উড়োজাহাজই প্রয়োজন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছিলেন, দেশের জন্য উভয় ধরনের উড়োজাহাজ প্রয়োজন এবং সরকার দুটিই সংগ্রহ করবে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ্য হচ্ছে একটি টেকসই ‘মিশ্র বহর’ গড়ে তোলা এবং একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা।

ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এয়ারবাসের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। বিশেষ করে A350-900-এর দীর্ঘপাল্লার সক্ষমতা বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে ফরাসি পক্ষের বক্তব্য। তবে কোন উড়োজাহাজ কোন রুটে সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা নির্ধারণে ক্রয়মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি দক্ষতা, যাত্রী ধারণক্ষমতা, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সামঞ্জস্যসহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

প্রতিরক্ষা খাতেও বহুমুখী সরবরাহকারী

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতেও সরবরাহকারী বৈচিত্র্যকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চীনের J-10CE সংগ্রহের উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে বর্তমানে J-10CE কেনার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো চীনের সঙ্গে আলোচনার প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে গেছে এবং খসড়া চুক্তিও প্রস্তুত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপ—তিন পক্ষের সঙ্গেই পৃথক অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

দিল্লির বার্তায়ও সম্পর্কের নতুন সুর

এদিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কূটনৈতিক বার্তা এসেছে। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, নয়াদিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী’ পথে এগিয়ে নিতে চায়। একই সঙ্গে বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে দুই দেশের সব দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে ভারত প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

এর আগে আগস্টেও জয়সওয়াল জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে সফরের সময়সূচি বা সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তের বিষয়ে তখন নির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

‘হেজিং’ নাকি কৌশলগত ভারসাম্য?

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে একাধিক শক্তিধর দেশের সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলকে অনেক সময় ‘হেজিং’ বা কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এর লক্ষ্য সাধারণত কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন অংশীদারের কাছ থেকে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাগত সুবিধা নেওয়া।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিমান ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের উদ্যোগকে সেই বৃহত্তর বাস্তবতার আলোকে দেখার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং, ইউরোপের এয়ারবাস এবং চীনের J-10CE—তিনটি ভিন্ন উৎসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে।

তবে এসব সিদ্ধান্তের বাস্তব মূল্যায়নে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত প্রয়োজন, সামরিক সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনা করা জরুরি।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে একটি বিষয় স্পষ্ট—ঢাকা বিমান ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতার পরিবর্তে একাধিক আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার পথ অনুসরণ করছে। এই নীতির ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।