মির্জা ফখরুলের বিদায়ে গম্ভীর তারেক রহমান, সভায় আবেগঘন পরিবেশ

মির্জা ফখরুলের বিদায়ে গম্ভীর তারেক রহমান, সভায় আবেগঘন পরিবেশ
মির্জা ফখরুলের বিদায়ে গম্ভীর তারেক রহমান, সভায় আবেগঘন পরিবেশ

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিদায় ঘিরে বিএনপির সভায় আবেগঘন পরিবেশ। তারেক রহমানকে দেখা যায় গম্ভীর ও নীরব। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় ফখরুলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা।

সংসদ ভবনের পুরো সভাজুড়ে যে একেবারেই হাসি ছিল না, তা নয়। কথার ফাঁকে কেউ কেউ হেসেছেন, স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারেক রহমানকে সেদিন যে রকম গম্ভীর ও নীরব দেখেছি, এমন দৃশ্য খুব বেশি মনে পড়ে না। পুরো সভায় তিনি ছিলেন একেবারেই চুপচাপ। মুখে ছিল গভীর চিন্তার ছাপ, চোখেমুখে ছিল আবেগ আর এক ধরনের অপ্রকাশিত কষ্ট।

এমনটা হয়তো স্বাভাবিকই। কারণ, দলের একজন মুরুব্বি, দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা এবং কঠিন সময়ে আস্থার প্রতীক হয়ে থাকা একজন মানুষকে চিরতরে হারানোর মুহূর্ত সামনে এলে আবেগ সামলে রাখা কঠিন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির জন্য শুধু একজন মহাসচিব ছিলেন না; দীর্ঘ একটি রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে তাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বেগম খালেদা জিয়া যখন কারাগারে, তারেক রহমান যখন দেশের বাইরে—তখন দলের সবচেয়ে কঠিন ও অনিশ্চিত সময়ের এক বড় অংশে বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এগিয়েছেন তিনি।

বিএনপির রাজনীতির সেই দীর্ঘ সময়টা সহজ ছিল না। একদিকে মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক চাপ, সাংগঠনিক সংকট; অন্যদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের ধরে রাখা, আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মসূচি পরিচালনা এবং দলের রাজনৈতিক অবস্থানকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কঠিন দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্যেই মির্জা ফখরুলকে সামনে থাকতে হয়েছে।

অনেক সময় দলের নেতাকর্মীদের কাছে তিনিই ছিলেন দৃশ্যমান ভরসার জায়গা। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে তিনি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন, কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং নানা সংকটের সময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছেন।

সেই কারণেই তাঁর বিদায় কেবল একটি সাংগঠনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিএনপির একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক স্মৃতি, সংগ্রামের সময়, অসংখ্য নেতা-কর্মীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং একটি কঠিন সময় পার করে আসার অভিজ্ঞতা।

দলের নেতারাও বিষয়টি জানেন। তাঁরা জানেন, মির্জা ফখরুলের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক কেবল পদ-পদবির সম্পর্ক ছিল না। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পথচলায় তৈরি হয়েছিল পারস্পরিক আস্থা, নির্ভরতা এবং এক ধরনের আত্মিক বন্ধন। তাই সভায় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি ছিল আবেগের একটি দৃশ্যমান আবহ।

সেদিনের পরিবেশে যেন আনন্দের চেয়ে স্মৃতিই বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। কেউ হয়তো মুখে কিছু বলেননি, কেউ আবেগ প্রকাশ করেছেন খুব সংযতভাবে। কিন্তু পুরো পরিবেশেই ছিল এক ধরনের নীরব বিষণ্নতা। মনে হচ্ছিল, সবাই বুঝতে পারছেন—একটি পরিচিত রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।

তারেক রহমানের গম্ভীর মুখও সেই আবেগকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল। রাজনৈতিক জীবনে অনেক কঠিন মুহূর্ত আসে, অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু কিছু মুহূর্ত ব্যক্তিগত আবেগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা, দলের প্রবীণ নেতা এবং আস্থার মানুষকে বিদায় জানানোর মুহূর্ত তেমনই একটি সময়।

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক যাত্রাটাও তাই নিছক একটি পদে থাকার ইতিহাস নয়। এটি বিএনপির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ইতিহাস। বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি, তারেক রহমানের দেশের বাইরে থাকা এবং দলের ওপর নানা রাজনৈতিক চাপের সময়ে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে আলাদা করে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে এই বিদায়ের কষ্ট হয়তো আরও গভীর। কারণ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু আদর্শ বা কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন একসঙ্গে পথ চলতে চলতে নেতার সঙ্গে কর্মীদের ব্যক্তিগত স্মৃতি তৈরি হয়। আন্দোলন, মিছিল, সভা, মামলা, গ্রেপ্তার, বিজয় কিংবা পরাজয়—সবকিছুর মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্ক।

মির্জা ফখরুলকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের সেই অনুভূতিটাই যেন সেদিনের সভায় ফুটে উঠেছিল।

একজন নেতা যখন দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর বিদায়ের প্রান্তে দাঁড়ান, তখন তাঁর সঙ্গে শুধু একটি পদ নয়, একটি সময়ও বিদায় নেয়। মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রেও হয়তো সেটিই ঘটছে।

তাই সেদিনের সভার নীরবতা শুধু একজন ব্যক্তিকে বিদায় জানানোর নীরবতা ছিল না। এর মধ্যে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযাত্রার স্মৃতি, সংগ্রামের দিনগুলোর কথা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনিবার্য বাস্তবতা।

আর তারেক রহমানের সেই গম্ভীর মুখ—হয়তো তারই একটি নীরব প্রতিচ্ছবি।

কিছু বিদায়কে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়। সেদিনের সভায় সেই অনুভূতিটাই সবচেয়ে বেশি ছিল। যারা বিএনপির দীর্ঘদিনের নেতাকর্মী, তাঁরাই হয়তো এই বিরহের গভীরতা সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারছেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
সংবাদ প্রতিনিধি

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।