কেন ভারতে সনাতন ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নেই

কেন ভারতে সনাতন ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নেই

ভারতে কেবল বিশ্বের বেশিরভাগ হিন্দু, জৈন এবং শিখই বসবাস করে না, এটি বিশ্বের একটি বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং কোটি কোটি খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও আবাসস্থল। ভারতের মতো একটি সজীব গণতান্ত্রিক দেশে সংখ্যালঘুসহ প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো সংবিধানই সুরক্ষিত রেখেছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার মানুষের সেই স্বাধীনতা রক্ষায় বদ্ধপরিকর।

ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৮৫% হিন্দু সনাতন ধর্ম, দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সম্প্রদায় ইসলাম জনসংখ্যার প্রায় ১২%, খ্রিস্টীয় ধর্মের লোক সংখ্যা ১.৭%, শিখ ১.১%, বৌদ্ধ ধর্ম ০.৩%, জৈন ধর্ম ০.০৯% অন্যান্য ধর্মের লোক ০.৬১%। মোট জনসংখ্যার ৮৫% হিন্দু ধর্মালম্বী থাকা সত্ত্বেও হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষার আইন নেই, বিদ্যালয়েও শিক্ষার অধিকার নেই।  অপরদিকে সংখ্যালঘু ধর্মীয় শিক্ষায় সব রকমের ব্যবস্থা নিহিত।

এবার দেখুন সংবিধানের ধারা গুলিঃ

ভারতীয় সংবিধানের ২৮(১) ধারায় বর্ণিতঃ রাজ্যনিধি হইতে সম্পূর্ণভাবে পোষিত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন ধর্মীয় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা যাইবে না।

২৮(৩) ধারায়ঃ কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন এরূপ কোন ব্যক্তিকে ঐ প্রতিষ্ঠানে যে ধর্মীয় শিক্ষাদান করা হয় তাহাতে অংশগ্রহণ করিতে, অথবা ঐ প্রতিষ্ঠানে বা ঐ প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কোন গৃহাদিপরিসরে যে ধর্মীয় উপাসনা অনুষ্ঠিত হয় তাহাতে উপস্থিত থাকিতে বাধ্য করা যাইবে না, যদি না তিনি স্বয়ং, বা তিনি নাবালক হইলে তাঁহার অভিভাবক, তাহাতে সম্মতি দেন।

৩০(১) ধারায়ঃ সকল সংখ্যালঘুবর্গের, ধর্মভিত্তিকই হউক বা ভাষাভিত্তিকই হউক, তাঁহাদের পছন্দমত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা করিবার অধিকার থাকিবে।

(আইন অনুসারে মুসলমান, খ্রিস্টান তাদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ধর্মীয় বিদ্যালয় চালু এবং পরিচালনা করতে পারে। অথচ হিন্দুদের অধিকার নেই)

৩০(ক১) ধারায়ঃ কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কর্তৃক স্থাপিত ও পরিচালিত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে অর্জন করিবার জন্য বিধি প্রণয়ন কালে রাজ্য ইহা সুনিশ্চিত করিবেন যে, ঐরূপ সম্পত্তি অর্জনের জন্য ঐরূপ বিধি দ্বারা স্থিরীকৃত বা তদনুযায়ী নির্ধারিত অর্থ এরূপ হয় যেন উহা ঐ প্রকরণ অনুযায়ী প্রত্যাভূত অধিকার সংকুচিত বা রদ না করে।

৩০(ক২) ধারাঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহে সাহায্যদানে রাজ্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিকূলে এই হেতুতে বিভেদ করিবেন না যে উহা কোন সংখ্যালঘুবর্গের পরিচালনাধীনে আছে, ঐ সংখ্যালঘুবর্গ ধর্মভিত্তিকই হউক বা ভাষাভিত্তিকই হউক।

(এই আইনে সংখ্যালঘুদের ধর্ম ইসলামী/ইংরেজী ভাষা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবে অথচ সনাতনীদের ধর্মীয় শিক্ষা কিংবা সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার অনুমতি নেই। )

নেহেরু এই আইনটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করলে বাবাসাহেব আম্বেদকর এর তীব্র বিরোধিতা করেন। বাবাসাহেব আম্বেদকর বলেছিলেন,”এই আইনটি হিন্দুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, তাই যদি এই পশু আইন সংবিধানে আনা হয়,আমি মন্ত্রিসভা এবং কংগ্রেস দল থেকে পদত্যাগ করব। অবশেষে বাবাসাহেব আম্বেদকরের ইচ্ছার সামনে নতজানু হতে হয়েছিল নেহরুকে।  এই ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যে হঠাৎ বাবাসাহেব আম্বেদকর কিভাবে মারা গেলেন? আম্বেদকরের মৃত্যুর পর নেহেরু এই আইনটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন।

এই আইন অনুসারে – হিন্দুদের মধ্যে হিন্দুদের তাদের “হিন্দুত্ব” শেখানোর অনুমতি নেই।  তাই হিন্দুদের তাদের প্রাইভেট কলেজে হিন্দু ধর্ম শেখানো যাবে না।  হিন্দু ধর্মের শিক্ষার জন্য কলেজ চালু করা যাবে না। হিন্দু ধর্ম শেখানোর জন্য হিন্দু স্কুল চালু করার আইন নেই। আইন এর অধীনে,পাবলিক স্কুল বা কলেজে হিন্দুধর্ম শেখানোরও অনুমতি নেই।

পক্ষান্তরে ইসলমান, খ্রিস্টান তাদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ধর্মীয় বিদ্যালয় চালু এবং পরিচালনা করতে পারে। এই আইনে সংখ্যালঘুদের ধর্ম ইসলামী/ইংরেজী ভাষা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবে অথচ সনাতনীদের ধর্মীয় শিক্ষা কিংবা সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার অনুমতি নেই।

 ভারতীয়রা ধর্মীয় সহিষ্ণুতাকে তাদের জাতীয়তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে দেখেন। প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলির বেশিরভাগ অনুসারী বলেছেন যে, “সত্যিকারের ভারতীয়” হতে গেলে সকল ধর্মকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং সহনশীলতা ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি একটি নাগরিক মূল্যবোধও: ভারতীয়রা সবাই একমত যে, অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন তাদের নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ার শর্তেরই একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এরপরেও কি ভারতের সংখ্যালঘুরা বলতে পারেন তারা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাতে আক্রান্ত হয়ে চলেছেন? দেশটিতে কোনো ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই? অথচ সমস্ত ইসলামিক রাষ্ট্র সংখ্যালঘুর অধিকার হরণ করেছেন। সেখানে সংখ্যালঘু ক্রমেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। সমীক্ষা বলছে বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে মোট জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। হিন্দুদের সংখ্যা না বেড়ে উল্টো কমেছে প্রায় ১ কোটি। আর ভারতে সংখ্যালঘুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।  এটাই ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতের সহনশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।