আজ ১০ আগস্ট, বিশ্ব জৈব জ্বালানি দিবস। প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে জৈব জ্বালানির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং এই খাতের উন্নয়নে উদ্যোগকে উৎসাহিত করতেই প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়।
জৈব জ্বালানি মূলত নবায়নযোগ্য জৈববস্তু থেকে উৎপাদিত জ্বালানি। পরিবেশবান্ধব এই জ্বালানির ব্যবহার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদা পূরণেও জৈব জ্বালানিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জৈব জ্বালানির প্রসার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষিজ ও জৈব বর্জ্যকে জ্বালানি উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হলে একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান ও অতিরিক্ত আয়ের পথ সৃষ্টি হতে পারে।
জৈব জ্বালানি ব্যবহারের অন্যতম লক্ষ্য হলো অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো। পাশাপাশি এর মাধ্যমে পরিবেশদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ রয়েছে। কৃষি ও শিল্পের বিভিন্ন বর্জ্য কাজে লাগিয়ে জ্বালানি উৎপাদন করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হতে পারে।
জৈব জ্বালানির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর সম্ভাবনা। কৃষি অবশিষ্টাংশ ও অন্যান্য জৈব উপাদান থেকে জ্বালানি উৎপাদনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।
জৈব ইথানল:
আখ, ভুট্টা, চিনিবিট ও কাসাভার মতো শর্করা বা স্টার্চসমৃদ্ধ কাঁচামাল থেকে ইথানল উৎপাদন করা যায়। এছাড়া কাঠ, বনজ অবশিষ্টাংশ ও বিভিন্ন শিল্পবর্জ্য থেকেও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ইথানল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
বায়োডিজেল:
উদ্ভিজ্জ তেল, ব্যবহৃত রান্নার তেল এবং বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ চর্বি প্রক্রিয়াজাত করে বায়োডিজেল তৈরি করা যায়। প্রচলিত ডিজেলের বিকল্প বা মিশ্র জ্বালানি হিসেবে এর ব্যবহার সম্ভব।
উন্নত জৈব জ্বালানি:
খাদ্যশস্যের পরিবর্তে কৃষি অবশিষ্টাংশ, অখাদ্য ফসল ও শিল্পবর্জ্য থেকে উৎপাদিত জ্বালানিকে উন্নত জৈব জ্বালানির আওতায় ধরা হয়। এ ধরনের জ্বালানির বড় সুবিধা হলো খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে কাঁচামাল ও জমি ব্যবহারের প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে কম। তৃতীয় প্রজন্মের জৈব জ্বালানি, জৈব হাইড্রোজেন ও জৈব-মিথানলভিত্তিক জ্বালানি এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
ড্রপ-ইন জ্বালানি:
জৈববস্তু, কৃষি অবশিষ্টাংশ ও শিল্পবর্জ্য থেকে উৎপাদিত এমন তরল জ্বালানি, যা বিদ্যমান জ্বালানি ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে সরাসরি বা প্রচলিত জ্বালানির সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়, তাকে ড্রপ-ইন জ্বালানি বলা হয়।
বায়ো-সিএনজি:
জৈববস্তু থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাসকে পরিশোধন ও সংকুচিত করে বায়ো-সিএনজি তৈরি করা হয়। পশুর গোবর, খাদ্যবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য এর গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। এর বৈশিষ্ট্য প্রচলিত সিএনজির সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতার কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। সেই বিবেচনায় জৈব জ্বালানি একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে জৈব জ্বালানির টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাঁচামালের উৎস, জমির ব্যবহার, খাদ্যনিরাপত্তা, উৎপাদন ব্যয় এবং পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন নিঃসরণের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।