ধ্রুত রাজাকার

ধ্রুত রাজাকার
 মোঃ জাবেদুল ইসলাম
১৯৭১ সাল এপ্রিল মাস। বাংলাদেশে তখন মুক্তিযোদ্ধু চলছে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা, বাঙালি জাতির উপর শাসন শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন চালাচ্ছিলো অকাতরে। পশ্চিম পাকিস্তানি দানবদের হাত হতে মুক্ত করার জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করলেন মুক্তিযুদ্ধের।
শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ চার দিকে যুদ্ধ আর যুদ্ধ। যুদ্ধ চলছে থম থমে সার দেশে। গ্রাম- গজ্ঞ,শহর – বন্দর, পথ-ঘাট,প্রচন্ড যুদ্ধ। কান পাতা যায় না। যুদ্ধ চলছে অবিরাম। এদেশের দামাল ছেলেরা, ছাত্র শিক্ষক,কৃষক – শ্রমিক,আনসার- পুলিশ, ইপিআর, সাধারণ সরকারি কর্মচারি- কর্মকর্তা,মজুর- কুলি,বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, গায়ক-গায়িকা এবং সাধারণ মানুষ এদেশের মুক্তিযুদ্ধে যাপিয়ে পড়েছিলো। যুদ্ধ চলছে বোয়ালমারী উপজেলায় একটি বৃহত্তম গ্রামে। গ্রামটি এ উপজেলা হতে আরও পনের কিলোমিটার পূর্বে একটি বিশাল জঙ্গলের ভিতরে।
বাহির হতে কেউ বুঝতেই পারবে না যে, এর ভিতরে মানুষের বসবাস আছে। গ্রামের মানুষেরা সবাই একত্রে হয়ে একে অপরের সঙ্গে পরামর্শ করছে। কি করা যায়, বর্তমান পেক্ষাপটে। তাদের মধ্যে একজন সাহসী,বুদ্ধিমান ও তেগি,নাম মহব্বত আলী হাত উচিয়ে বল্লো আমরা সবাই প্রতিবাদ করব।যুদ্ধ করব,বঙ্গবন্ধু মুক্তি যুদ্ধুের ডাক দিয়েছে,তোমরা তা জানো না? মহব্বত আলী কথা শুনে সবাই এক কন্ঠে বলে উঠলো হ- হ,আমরা সবাই শুনেছি। মহব্বত আলী এবার সকলের উদ্দেশ্য বলে উঠলো, ভাইরা আমার,দেশের এই ক্লান্তিলগ্নে আমাদের নিবোর্ধের মত চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের সাবধানে, চুপিসারে,দেশের মানুষকে একত্রিত করতে হবে।
সংঘটিত করতে হবে। মানুষকে বুঝাতে হবে। হতাশ হলে চলবে না। বুকে সাহস রাখতে হবে। মনোবল রাখতে হবে। আমাদের স্বাধীনতা,রক্ষা করা ও আমাদের দায়িত্ব আমাদের। মহব্বত আলীর কথায় সবাই এক কন্ঠে সায় দিয়ে উঠলো। সবাই বল্ল হ- হ ঠিক কথা। আমাদের স্বাধীন, ঐ হারামজাদার বাচ্চারা কেড়ে নিতে চায়। তা কোন ভাবেই দেয়া যাবে না। মহব্বত আলী, তোমরা সবাই শোন,আমাদের তো হারাম খোরদের মত ভারী আগ্নেয়গিরি অস্ত্র নাই।
তাহলে কি করতাম? শোন,অল্পতে ঘাবরাইলে চলবে না। আমাদের সবার বুদ্ধি, মনোবল,কৌশল, সাহস কে কাজে লাগাতে হবে। হারাধন বলে উঠলো। দাদা ঠিক কথাই বলেছে। হারাধন,দাদা আপনি বলেন,আমরা যুদ্ধ করবো। মহব্বত আলী, হ্যাঁ,হারাধন,আমাদের বাঁচতে হলে যুদ্ধ করতে হবে। চলো সবাই যুদ্ধে চলো,হারাধন। মহব্বত আলী, এই শোন শোন, যুদ্ধ হবে কৌশলে। আমাদের ভারী অস্ত্র নাই। আমাদের ট্রেনিং নিতে হবে।আমার দুই বন্ধু ভারতের অফিসার সেনা,আমার সাথে তার যোগাযোগ হয়েছে। আজ রাতে তারা আমাদের এই গ্রামে প্রবেশ করবে। আমাদেরকে এ গ্রামটা কে পাহারা দিতে হবে।যেন অন্য কোন অপরিচিত লোক এ গ্রামে প্রবেস করতে না পারে।
সবাই মহব্বত আলী কথা সায় দিলো। এবার,যার যার ঘরে সেই সেই চলে গেল। বিকেলে তিন টা বাজে কি ঠিক এই রকম সময় একটা লোক, বয়স হবে প্রায় পয়তাল্লিশ কি/ পঞ্চাশ বছর বয়স্ক মানুষ, পরনে আলখাল্লা পাঞ্জাবী পায়জামা মাথায় টুপি, ও লম্বা দাড়ি ওয়ালা। গ্রামে প্রবেশ করে হাউ মাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে দিল।চোখের পানি অঝরে ঝরতেছে তার চোখ দিয়ে, গ্রামের একজন যুবক তাকে জিজ্ঞেস করল, কি হলো রে বুড়ো? তুই কাদঁছিস কেন? তোর বাড়ি কোথায়? তুই এখানে এলি কি ভাবে? কে তোকে এখানে পাঠিয়েছে? তোর উদ্দেশ্য কি? যুবকের কথা শুনে বুড়ো তার মুখের ভিতরের জিহ্বা টা অর্ধেক কামড়ে ধরে তার নিজের দূই গালে চর মারতে মারতে বলে তওবা, তওবা, আমাকে কে পাঠাবে? আমার পরিবার আত্মীয় স্বজনদেরকে
বুড়োর খুশি আর ধরে না। সায়মা ঘুমোনোর ভান ধরে বিছানায় নেতিয়ে পড়েছে। বুড়ো খুশি খুশি ভাব নিয়ে সায়মার কাছে গিয়ে বসল। এ কথা ও কথা বলতে বলতে সায়মার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। সায়মার হাতে ছিলো জালের রশি। সায়মা রশি টান দিতেই বুড়োর গায়ে জাল পরলো। সায়মা এক লাফ দিয়ে উঠলো, বুড়োকে জাল দিয়ে ইচ্ছেমত পেচিয়ে ঘরের খাম্বার সাথে বেধে রাখলো। তারপর আস্তে আস্তে ঘরের দরজা খুলে বের হয়ে আসে। বাহিরে মুক্তিযোদ্ধাদের এলোপাতারী গুলির তোপের মুখে পাকিস্তানীর কেউ প্রাণে মারা গেল,কেউ পঙ্গু হলো, আবার প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেল।
এবার বুড়ো ধ্রুত রাজাকারকে বের করে আনা হলো সায়মার ঘর হতে। জিগাস করা হলো তাকে কেন তুই পাকিস্তানীদের সাহায্য করছিস। তুই বাঙালী হয়ে বাঙালীদর সর্বনাস করছিস। তোর আর বেঁচে থাকার অধিকার নেই এই স্বাধীন বাংলাদেশে, এই বলে সকল মুক্তিযোদ্ধা আক্রোশের সাথে একযোগে ঐ বুড়ো ধ্রুত রাজাকারকে ব্রাশফায়ার করে দিল। এর পর সকল মুক্তিযোদ্ধা এক কন্ঠে জয় বাংলা বলে লাল সবুজের পতাকা টাঙিয়ে দিলেন। ও দিকে পাকিস্তানীরা রাতারাতি ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। রাত পোহালে পুরো উপজেলা হানাদার মুক্ত হলো। বাঙালী হয়ে বাঙালীদের বিরুদ্ধে ধ্রুত রাজাকারী কান্ড-কারবার, পৃথিবীর ইতহাসে একটি কলঙ্কময় অধ্যায়।যত বাংলার মানুষ বেঁেচ থাকবে, বাঙালী জাতি বেঁচে থাকবে, বাংলাদেশ বেঁচে থাকবে, ততদিন বীর সেনা, সায়মার মত বীরঙ্গনাদেরকে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে, সেই সাথে বেইমান ধ্রুত রাজাকারদেরকে ঘৃনা করবে। জয় বাংলা।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
ACP
সংবাদ প্রতিনিধি

ACP

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।