ভারতের দ্বিতীয় হাই-স্পিড রেল বা বুলেট ট্রেন প্রকল্প হিসেবে দিল্লি-বারাণসী করিডর এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। মুম্বই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্পের পর এটিকে দেশের অন্যতম বড় রেল অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দিল্লি থেকে বারাণসী পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে চার ঘণ্টারও কম। পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহর প্রথমবারের মতো হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে। দিল্লি-বারাণসী বুলেট ট্রেন, সর্ব্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ৩২০ কিমি
বর্তমানে প্রকল্পটির ডিটেইলড প্রজেক্ট রিপোর্ট (DPR) প্রস্তুত করছে ন্যাশনাল হাই স্পিড রেল কর্পোরেশন লিমিটেড (NHSRCL)। একই সঙ্গে সম্ভাব্য রুট নির্ধারণে LiDAR প্রযুক্তির মাধ্যমে আকাশপথে জরিপও চলছে। যদিও প্রকল্পটি কেন্দ্র সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে, তবুও এটি এখনও রেল বোর্ডের চূড়ান্ত প্রযুক্তিগত ও আর্থিক অনুমোদনের অপেক্ষায়।
৮৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ করিডর, সর্বোচ্চ গতি ৩২০ কিমি
প্রস্তাবিত দিল্লি-বারাণসী হাই-স্পিড রেল করিডরের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৮৬৫ কিলোমিটার। ট্রেনের নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ৩৫০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা হলেও বাণিজ্যিকভাবে এটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩২০ কিলোমিটার গতিতে চলবে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে দিল্লি থেকে বারাণসী যেতে সময় লাগবে মাত্র ৩ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট, যা বর্তমান রেল ভ্রমণের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সম্ভাব্য ব্যয়
এই বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১.২১ লক্ষ কোটি টাকা থেকে ১.৭১ লক্ষ কোটি টাকা। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারতের দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সম্ভাব্য স্টেশনসমূহ
করিডরটি দিল্লির সরাই কালে খান থেকে শুরু হয়ে উত্তরপ্রদেশের ২২টিরও বেশি জেলার ওপর দিয়ে বারাণসী পর্যন্ত যাবে। বর্তমানে ১২ থেকে ১৩টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্ভাব্য স্টেশনগুলো হলো—
- সরাই কালে খান-হজরত নিজামুদ্দিন
- জেওয়ার (নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর)
- মথুরা
- আগ্রা
- ইটাওয়া
- কান্নৌজ
- লখনউ
- রায়বরেলি
- প্রয়াগরাজ
- ভাদোহি
- বারাণসীর মাণ্ডুয়াদিহ
এছাড়া লখনউ ও অযোধ্যাকে সংযুক্ত করতে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পৃথক লিঙ্ক করিডরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে দ্রুত সংযোগ
এই প্রকল্পের অন্যতম বড় সুবিধা হবে জেওয়ারে নির্মাণাধীন নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে দ্রুত রেল সংযোগ। দিল্লি ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের যাত্রীরা স্বল্প সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে পারবেন। একইভাবে বিমানযোগে আগত দেশি-বিদেশি যাত্রীরাও সহজেই লখনউ, মথুরা, অযোধ্যা ও বারাণসীর মতো শহরে যাতায়াত করতে পারবেন।
পর্যটন ও ধর্মীয় ভ্রমণে নতুন সম্ভাবনা
এই হাই-স্পিড করিডর চালু হলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যাতায়াত আরও সহজ হবে। বিশেষ করে—
- কাশী বিশ্বনাথ মন্দির
- অযোধ্যার রাম মন্দির
- প্রয়াগরাজের সঙ্গম
- আগ্রার তাজমহল
—এসব গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রুটে পরিবর্তনের চিন্তা
প্রাথমিকভাবে জাতীয় সড়ক-২ বরাবর করিডর নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে প্রকৌশলীরা রুট পুনর্বিবেচনা করছেন। কারণ ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার গতিতে চলা ট্রেনের জন্য দীর্ঘ ও অপেক্ষাকৃত সোজা ট্র্যাক প্রয়োজন। তাই বাঁক কমিয়ে আরও কার্যকর রুট নির্ধারণের কাজ চলছে।
কানপুর স্টেশন নিয়ে বিতর্ক
বর্তমান প্রস্তাবে উত্তরপ্রদেশের অন্যতম বড় শিল্পনগরী কানপুরকে মূল করিডরের স্টেশন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ নিয়ে রাজনৈতিক ও জনপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা DPR পুনর্বিবেচনা করে কানপুরকে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
ভবিষ্যতে শিলিগুড়ি পর্যন্ত সম্প্রসারণের সম্ভাবনা
জাতীয় রেল পরিকল্পনা ২০৩০-এর আওতায় দিল্লি-বারাণসী করিডরকে আরও পূর্বদিকে সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। প্রস্তাবিত বারাণসী-শিলিগুড়ি হাই-স্পিড রেল করিডরের দৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ৭৬০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার।
সম্ভাব্য রুটে থাকতে পারে—
- বারাণসী
- বক্সার
- পাটনা
- মুজফ্ফরপুর বা দরভাঙ্গা
- পূর্ণিয়া বা কাটিহার
- কিশনগঞ্জ
- শিলিগুড়ি
- নিউ জলপাইগুড়ি
এই সম্প্রসারণ বাস্তবায়িত হলে বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি যেতে বর্তমানের প্রায় ১২ ঘণ্টার পরিবর্তে সময় লাগতে পারে মাত্র ২.৫ থেকে ৩ ঘণ্টা। আর দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত পুরো যাত্রা শেষ করা সম্ভব হতে পারে ৬ থেকে ৬.৫ ঘণ্টায়।
তবে উল্লেখ্য, দিল্লি-বারাণসী এবং বারাণসী-শিলিগুড়ি—উভয় প্রকল্পই এখনও পরিকল্পনা ও মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন, অর্থায়ন এবং নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পরই সম্ভাব্য সময়সূচি ও রুট নিশ্চিত হবে।
SEO Keywords:




