তীব্র গরমের মধ্যে জ্বালানি সংকটে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের পর দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বন্ধ থাকছে, আবার কোনো কোনো এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কথা জানিয়েছেন গ্রাহকেরা।
বিদ্যুতের এমন পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে। কিছু কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে বলেও জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, এক দিন আগেও কিছুটা জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছিল। পরে সেই সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। এতে শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের ক্ষোভ তীব্র হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও সেই ক্ষোভ বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনায় রূপ নিয়েছে। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিভাগের কার্যালয়, উপকেন্দ্র এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা চেয়ে বুধবার পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন।
সংগঠনটির হিসাবে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে সরবরাহ মিলছে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। ফলে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে এবং কিছু বিদ্যুৎ স্থাপনা হামলার শিকার হচ্ছে।
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের একটি এরিয়া অফিসে হামলার খবর পাওয়া গেছে। পার্বতীপুর জোনাল অফিসের আওতাধীন ভবের বাজার ইনডোর উপকেন্দ্রেও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তার জন্য পুলিশের কাছে আবেদন করেছে। গোপালগঞ্জে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি—ওজোপাডিকোও নিরাপত্তা চেয়েছে।
আরও পড়ুনঃ পাঁচ জেলায় ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত
লোডশেডিংয়ে সমন্বয়ের নির্দেশ
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কার্যালয় ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে সব বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানকে লোড ম্যানেজমেন্টে সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো একটি এলাকায় অতিরিক্ত এবং অন্য এলাকায় তুলনামূলক কম লোডশেডিং না করে যতটা সম্ভব ভারসাম্য রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদনে বাধা
দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা বর্তমানে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। তারপরও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এর প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট। উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কয়লা না পাওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি কিছু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র কারিগরি ও অন্যান্য সমস্যায় উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।
বর্তমান সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকা, কয়লাভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্রের উৎপাদন সমস্যা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ।
এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটিতে কমেছে গ্যাস সরবরাহ
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ গ্যাসনির্ভর। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না।
এ ছাড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিছু ইউনিটেও জ্বালানি ও কারিগরি সমস্যায় উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে এর প্রভাব পড়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা থাকায় জ্বালানি সংগ্রহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
১০ আগস্ট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট
গত ২৮ জুলাই থেকে দেশে লোডশেডিং বাড়তে শুরু করে। এরপর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। ১০ আগস্ট দুপুরে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যায়।
ওই সময় ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ঢাকা অঞ্চলে ৬ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৮৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। দেশের অন্যান্য এলাকাতেও চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুনঃ ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট, আজ মনোনয়ন জমা
চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অনেক কম
পেট্রোবাংলার তথ্যেও গ্যাস সংকটের চিত্র স্পষ্ট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে মঙ্গলবার সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট।
অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলমের মতে, এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দ্রুত লোডশেডিং কমার সম্ভাবনা কম। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
পরিস্থিতি স্বাভাবিকের আশ্বাস
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, ১১ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে একটি কৌশলগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ১২ আগস্ট সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হওয়ার আশা করা হয়েছিল।
তবে সংকট পুরোপুরি কাটতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক সমস্যার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ানোও সম্ভব নয়। ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধের নির্দেশ
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধের সময় আরও এগিয়ে আনা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সারা দেশে এসব প্রতিষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে।
এ ছাড়া সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ এবং সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার রাতে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জেলা প্রশাসকদের কাছে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়।
এর আগে ১১ জুনের নির্দেশনায় শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সেই সময় এক ঘণ্টা কমানো হয়েছে।
মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে বলা হয়েছে। তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ওষুধের দোকানসহ জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠান এই সময়সীমার বাইরে থাকবে।
সব মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সমস্যা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার চাপ—এই কয়েকটি কারণে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সংকটের মুখে পড়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে লোড ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে সংকটের বড় অংশ গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।




