জহির উদ্দিন স্বপনের “গণমাধ্যম সংস্কারে নতুন পথের উদ্যোগ” এর কি হবে?

জহির উদ্দিন স্বপনের “গণমাধ্যম সংস্কারে নতুন পথের উদ্যোগ” এর কি হবে?
https://thenewse.com/গণমাধ্যম-সংস্কারে-নতুন-প/

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জহির উদ্দিন স্বপন বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা খাতে আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিবর্তিত প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের দ্রুত রূপান্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের সংবাদমাধ্যমকে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।

বিশেষ করে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে গণমাধ্যমের বিদ্যমান কাঠামো ও কর্মপদ্ধতিতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন স্বপন।

ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর

ইন্টারনেট, ক্লাউড প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন জহির উদ্দিন স্বপন।

তার পরিকল্পনায় গণমাধ্যমের প্রচলিত কাঠামোর পাশাপাশি ডিজিটাল অবকাঠামো, আধুনিক কর্মপদ্ধতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সংবাদ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি ছিল।

সাংবাদিকতাকে শ্রম আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ

সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, কর্মপরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিও স্বপনের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছিল।

সাংবাদিকতা পেশাকে আধুনিক শ্রম ও শিল্প আইনের কাঠামোর সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে তিনি উদ্যোগী ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা, অধিকার এবং কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করার একটি কাঠামো তৈরির লক্ষ্য ছিল।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছিলেন স্বপন। তার দৃষ্টিভঙ্গিতে সাংবাদিকদের ভয়মুক্ত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ যেমন নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তেমনি গণমাধ্যমের রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাগত জবাবদিহিতাও থাকা জরুরি।

স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখার বিষয়টি তার বক্তব্য ও উদ্যোগে গুরুত্ব পেয়েছে।

তথ্য কমিশন গঠনে ভূমিকা

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ প্রণয়ন এবং তথ্য কমিশন গঠনে বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

তথ্য অধিকার আইনের রূপরেখা: সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালে তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষেত্রে এবং ২০০৯ সালে তা পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত করার প্রক্রিয়ায় তিনি নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন নাগরিক ফোরামের (যেমন—এমআরডিআই ও সুশাসনের জন্য নাগরিক) সাথে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন।

কমিশন গঠনে ভূমিকা: তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে স্বাধীন ‘তথ্য কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করার জোর দাবি ও খসড়া তৈরিতে তিনি অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান, পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজকে নিয়ে ৫ সদস্যের বাছাই কমিটি পুনর্গঠন করেছে সরকার।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও তথ্য অধিকার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এটি তাঁর অন্যতম প্রধান সামাজিক-রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।

অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়

গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে একতরফা সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন জহির উদ্দিন স্বপন।

এ লক্ষ্যে সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় ও আলোচনা চালানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। গণমাধ্যমের বাস্তব সমস্যা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং সাংবাদিকদের পেশাগত চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সরাসরি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মতামত নেওয়াকে তিনি সংস্কার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।

অসমাপ্ত উদ্যোগের প্রশ্ন

স্বপনের দায়িত্বকালে আলোচিত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পাওয়ার আগেই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন এসেছে। ফলে গণমাধ্যম সংস্কারের যেসব পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল, সেগুলোর ভবিষ্যৎ এখন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থের নীতিগত অবস্থান ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা—এই চারটি ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সংস্কার কতটা এগোয়, সেটিই আগামী দিনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে।

জহির উদ্দিন স্বপনের উদ্যোগগুলোর মূল্যায়নও শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এসব পরিকল্পনার কতটুকু নীতিগত পর্যায় থেকে বাস্তব সংস্কারে রূপ নেয় এবং পরবর্তী সরকার বা মন্ত্রণালয় সেগুলোর কতটা ধারাবাহিকতা বজায় রাখে তার ওপর।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।