বরিশালে মাদকের ভয়ংকর বিস্তার: শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর নাম ফাঁস!

বরিশালে মাদকের ভয়ংকর বিস্তার: শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর নাম ফাঁস!
বরিশাল নগরীতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে মাদকের চাহিদা ও বিস্তার। নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বাজার ও বস্তিতে প্রকাশ্যে চলছে মাদকের রমরমা ব্যবসা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অবাধে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ ও যুবসমাজ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদক ব্যবসায় এখন পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবরাহ ও বিক্রি করা হচ্ছে। সহজলভ্যতার কারণে অল্প বয়সী শিক্ষার্থী ও তরুণদের একটি বড় অংশ মাদকের ভয়াল থাবায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে।
মাদককে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত নগরীতে ঘটছে ঝগড়া, মারামারি, কোপাকুপি, ছিনতাই এবং হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, ধরপাকড় ও মাদক উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতা এবং প্রভাবশালী গডফাদারদের ছত্রছায়ায় মূল হোতারা অধিকাংশ সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সময় শীর্ষ মাদক কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও অল্পদিনের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও পুরোদমে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। ফলে অভিযান পরিচালনার পরও স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে আসছে না মাদকের বিস্তার।
বর্তমানে বরিশাল নগরীর পলাশপুর, রসুলপুর এবং শিশু পার্ক কলোনিকে মাদকের সবচেয়ে ভয়াবহ হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, এসব এলাকায় শতাধিক সক্রিয় মাদক ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। সম্প্রতি পলাশপুর এলাকায় মাদককে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৫ নম্বর পলাশপুর ও বৌ বাজার এলাকা ইয়াবার পাইকারি ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র। এখানে মাদক কারবারের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত মুরগী কালাম, শহিদ ওরফে মাছ শহিদ ও তার স্ত্রী ববি। তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানিক এবং জয়ফুলের গলির রাসেল।
বৌ বাজার ও ৭ নম্বর পলাশপুর এলাকায় পাইকারি ইয়াবা সরবরাহ করছে রিপন ও আমিন। তাদের হাত ধরে ৪ নম্বর গলির ভজো রাকিব, নাছির, ডিজে আলাউদ্দিন ও শান্ত এবং ১২ নম্বর গলির খাটো বাবুল পুরো এলাকায় ইয়াবার বিস্তার ঘটিয়েছে।
ইসলামনগর এলাকায় ভাসাই এবং স্বপন-পারভিন দম্পতি তাদের ছেলে আরিফকে নিয়ে গড়ে তুলেছে একটি বড় পাইকারি ইয়াবা সিন্ডিকেট। একই নেটওয়ার্কে সক্রিয় রয়েছে সোহেল ওরফে নিগ্রো সোহেল, রাসেল, রাজিব, স্বপন-রহি দম্পতি ও তাদের ছেলে জীবন, এবং কলি ও তার ছেলে আকাশ।
২ নম্বর পলাশপুরে ইয়াবার পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা সমানতালে চলছে। এখানে শাহিন ওরফে প্যাডা শাহিন ও তার স্ত্রী মুন্নি, কালা বাপ্পি এবং আখি একটি শক্তিশালী চক্র পরিচালনা করছে। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে চাপা সোহেল ও মধু।
মাজেদের তিন ছেলে—আলিফ, অপু ও শাকিল—এলাকার পাইকারি ইয়াবা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়া ইমরান, নমো সজিব ও বাপ্পিও নিয়মিত সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত।
মোহাম্মদপুর এলাকায় খুচরা ইয়াবা বিক্রিতে সক্রিয় রয়েছে মান্না সুমন ও শিল্পি, ভান্ডারি সোহেল, সদায় নাঈম, কাইম, জাহাঙ্গীর ও তার ছেলে রুবেল। গাঁজা ও ইয়াবার যৌথ ব্যবসা চালায় রানা-পপি দম্পতি, কানা সোহাগ ও তার শ্যালক রাজু।
জনি-ঝুমুর দম্পতি তাদের ছেলে বিশাল ও ববিকে নিয়ে, রক্ত রানা ও তার খালু মুন্না, নয়ন, বাঘা শহিদ, জীবন, কুট্টি, এবং নয়নের দুই ছেলে রেমান ও হারিছও এই ব্যবসায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, মোহাম্মদপুর এলাকার এই চক্রকে পরোক্ষভাবে শেল্টার দিচ্ছে ওকত, নয়ন, মজনু ও সোহাগ নামে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি।
৬ নম্বর ওয়ার্ডের শিশু পার্ক কলোনি এখন ইয়াবা পাচার ও বিক্রির অন্যতম কেন্দ্র। এখানে বাবুলের ছেলে আলামিন ওরফে আইকা আলামিনকে বড় পাইকারি বিক্রেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এলাকার অন্যান্য সক্রিয় সদস্যদের মধ্যে রয়েছে কডা মিরাজ, বাডি মিরাজ, পিচ্চি সিয়াম, জামাল-লতা দম্পতি, জামাই হাসান-পাখি দম্পতি, তানিয়া (স্বামী নাগর), তার ভাই টিকলি সুমন ও সুমনের স্ত্রী খাদিজা।
এছাড়া কালা মামুন, পাইক সিয়াম, ফারুক, বাপ্পি, আরকে রাব্বি, রনি, নকি আলামিন, রাজু, রিয়াজ এবং তিন ভাই সেন্টু, রিপন ও রাহাতও সক্রিয়ভাবে মাদক ব্যবসায় জড়িত বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
রসুলপুর এলাকাকে বর্তমানে বরিশাল নগরীর সবচেয়ে বড় মাদক হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানকার মূল হোতা ফিরোজা বেগম (সোহাগীর মা) এবং তার বেয়াই ইব্রাহিম। তারা সরাসরি টেকনাফ ও চিচট্টগ্রাম থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান এনে বরিশালে সরবরাহ করে।
একই রুটে সালমা (স্বামী নাঈম) মাদক পাচারে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। পাইকারি গাঁজা বিক্রির দায়িত্বে রয়েছে নাসির।
সবচেয়ে আলোচিত স্পট পরিচালনা করে রবের মেয়ে পাখি ও তার স্বামী রাকিব। স্থানীয়দের দাবি, তাদের ঘরের ভেতরে দিন-রাত প্রকাশ্যে ইয়াবা বেচাকেনা চলে।
রসুলপুরের অন্যান্য অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছে কমলা-জসিম দম্পতি, খুকু-নাসির দম্পতি, দিপু-পূন্নি দম্পতি, সিরাজ-নদি দম্পতি, আলামিন-জুলি দম্পতি, রুপা ও তার স্বামী আকাশ, হিরা, আখি-রাসেল দম্পতি, মনির, খলিল, মাহাবুব ও অপু।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের ৫নং ওয়ার্ডের শীর্ষ নেতাদের ছত্রছায়ায় এ মাদক ব্যবসা চলে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহিতা না থাকায় বরাবরই আড়ালেই থেকে যায় তারা! তাই মাদক ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ওয়ার্ডের শীর্ষ নেতাদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে পারলে মাদক ব্যবসা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের  উপ-পুলিশ কমিশনার সুশান্ত সরকার জানান, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। নগরীকে মাদকমুক্ত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
নগরবাসীর মতে, এখনই কার্যকর নিরপেক্ষ ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে। তাই শান্তজনপদ  বরিশালকে  ভয়াভয়
বিপর্যায়ে হাত থেকে রক্ষায় দ্রুত মদকের বিস্তার রোধে  প্রশাসনের সর্বাত্মক ও দৃশ্যমান উদ্যোগ কামনা করছেন বরিশালবাসী।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।