অভিনেত্রী হুমায়রা হিমুর রহস্যজনক মৃত্যু হত্যা না আত্মহত্যা?

অভিনেত্রী হুমায়রা হিমুর রহস্যজনক মৃত্যু হত্যা না আত্মহত্যা?

ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী হুমায়রা হিমু মারা গেছেন। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন অভিনয় শিল্পী সংঘের সভাপতি আহসান হাবিব নাসিম। তবে কি কারণে তিনি মারা গেছেন তা এখণও জানা যায়নি। । কী হয়েছিল সেটা পরে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন নাসিম। তিনি বলেন, অভিনেত্রী হুমায়রা হিমু মারা গেছেন। আজ সাড়ে তিনটার দিকে উত্তরার একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা হিমুকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘শুনেছি, একজন যুবক হিমুকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এরপর সেই যুবক তার মোবাইলসহ পালিয়ে গেছেন। হাসপাতালে শিল্পী সংঘের পক্ষ থেকে উর্মিলা শ্রাবন্তী কর ও রওনক হাসান হাজির হয়েছেন। তারা বিস্তারিত জেনে জানানোর পরই বলতে পারব মৃত্যুর আসল কারণ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ‘হিমুর মরদেহ রেখেই পালিয়ে যায় অভিনেত্রীর সেই বন্ধু। পুলিশ মিহিরকে সঙ্গে নিয়ে হিমুর সেই বন্ধুকে খুঁজছে।

রাত ৮টার দিকে হুমায়রা হিমুর লাশের সুরতহাল করেন উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক মাসুদা খাতুন। সুরতহাল শেষে মাসুদা খাতুন বলেন, হুমায়রা হিমুর পরিচিত দুইজন তাকে হাসপাতালে এনেছিল। আমরা তাকে হাসপাতালেই পেয়েছি। এখানেই আমরা প্রাথমিকভাবে হুমায়রা হিমুর লাশের সুরতহাল করেছি। তার শরীরে কোন আঘাত বা চিহ্ন ছিল না। তবে তার গলায় রশির দাগ পাওয়া গেছে। সম্ভবত তিনি আত্মহত্যা করেছেন। মৃত্যুর আসল কারণ চিকিৎসক বলতে পারবে। এজন্য ময়না তদন্তের জন্য লাশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছি। সেই রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয় করছেন হোমায়রা হিমু। তবে কয়েক বছর ধরে অভিনয়ে খুব একটা নিয়মিত ছিলেন না। এ নিয়ে তার মধ্যে একরকম অভিমানও কাজ করেছিল। বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ভিউ না থাকার কারণে তাকে সেভাবে অভিনয়ে সুযোগ দিতেন না পরিচালক ও প্রযোজকেরা।

হোমায়রা হিমু ১৯৮৫ সালের ২৩ নভেম্বর লক্ষ্মীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। লক্ষ্মীপুরে ছোটবেলা কেটেছে হোমায়রা হিমুর। ক্লাস টুতে পড়ার সময় থেকেই কাজ করতেন মঞ্চে। বেসরকারি টিভি চ্যানেল দেশ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিমু নিজেই বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকেই স্থানীয় হাইফাই কৌতুক শিল্পগোষ্ঠী ও ফ্রেন্ডস নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতেন তিনি।

হিমু যখন স্কুলের ছাত্রী, তখন তার স্কুলের এক বড় বোন শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন করেন। ঢাকা থেকে শুটিং করে স্কুলে ফেরার পর সবাই তাকে দেখতে আসেন। তখন তাকে দেখেই টিভিতে কাজ করার ইচ্ছা হয়। তবে ছোটবেলায় হিমুর ইচ্ছা ছিল এয়ার হোস্টেজ হওয়ার। কিন্তু ঘটনাচক্রে হয়ে ওঠেন অভিনেত্রী।

১৯৯৯ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর ঢাকায় আসেন হিমু। প্রথমে ভর্তি হন নাগরিক নাট্যাঙ্গনে। এরপর কাজ করেন আরও কয়েকটি নাটকের দলে। এরপর এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে ফটোশুট করে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থায় মডেলিংয়ের জন্য জমা দেন। তখন এইডস নিয়ে সচেতনতামূলক একটি বিজ্ঞাপনে কাজ করেন। পরে দেখা যায় আরও কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রে। একটি চায়ের বিজ্ঞাপনচিত্রে তাকে দেখার পর প্রথম হিমুকে নাটকে সুযোগ দেন নির্মাতা তাহের শিপন। নাটকের নাম ছিল ‘পি আই’। তার প্রথম সহশিল্পী ছিলেন প্রয়াত দিলীপ চক্রবর্তী।

২০০৫ সালে বিনোদন দুনিয়ায় কাজ শুরু করেন হুমায়রা হিমু। এই সময়ে তার আসল নাম হুমায়রা নুসরাত হিমু থেকে হোমায়রা হিমু হয়। তার এই নাম বদলের পেছনে রয়েছে অভিনেতা টনি ডায়েসের ভূমিকা। এ প্রসঙ্গে দেশ টিভিকে দেওয়া একই সাক্ষাৎকারে হিমু বলেছিলেন, ‘টনি ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম একটা টেলিফিল্ম করি। উনি তখন আমাকে বলেন, “তুমি দুই অক্ষরের নাম দাও।” এর আগে আমি কেবল “হিমু” বলে পরিচয় দিতাম। তখন টনি ভাই বলেন, “পৃথিবীর যত বিখ্যাত মানুষ আছে সবার নাম দুই অক্ষরের।” এর পর থেকেই আমি হোমায়রা হিমু হয়ে যাই।’

টিভি নাটকে অভিনয় শুরুর পর নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় তার অভিনয় দর্শকের মধ্যে সাড়া ফেলে। ‘সোনাঘাট’, ‘চেয়ারম্যান বাড়ি’, ‘বাটিঘর’, ‘শোনে না সে শোনে না’, ‘কমেডি-৪২০’, ‘চাপাবাজ’, ‘অ্যাকশান গোয়েন্দা’, ‘ছায়াবিবি’, ‘এক কাপ চা’, ‘এ কেমন প্রতিদান’, ‘হুলো বিড়াল’, ‘ছন্নছাড়া ৪২০’, ‘অ্যাম্বুলেন্স ডাক্তার’, ‘পাগলা প্রেমিক’ ইত্যাদি নাটকে দেখা গেছে তাকে। ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় হিমুর। সিনেমাটিতে তরু আপা চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে আফসোসের কথা তুলে ধরেন নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী। তিনি লেখেন, প্রিয় হিমু। যদিও তোমার সঙ্গে অনেকদিন কথা হয়নি, তাও এক বছর হলো। কিন্তু কাজটা তুমি একদম ভালো করোনি। ভীষণ রাগ হচ্ছে। যত যাই হোক, জীবন একটাই আর জীবন সুন্দর। বেঁচে থাকাটা অনেক আনন্দের। এসময় আফসোস করে চয়নিকা লিখেছেন, আসলেই তুমি একটা অন্যায় কাজ করেছ নিজের ওপর। একা একা চলে গেলে? নিজে নিজেই? তোমার আশে পাশের মানুষ একদম ভালো ছিল না। তোমাকে বকাও দিয়েছিলাম। আজ মনে হচ্ছে, বকাটা কন্টিনিউ করতাম যদি!

নির্মাতা এস এ হক অলিক লেখেন, এক সময় আমার অনেকগুলো নাটকে অভিনয় করেছিল হিমু। কয়েকদিন আগে কায়সার আহমেদ ভাইয়ের শুটিংয়ে অভিনয় করতে গিয়ে হিমুর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হলো কাজ নিয়ে, জীবন নিয়ে। এইমাত্র শুনলাম ও চলে গেছে!! ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

হুমায়রা হিমুর মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না মেহজাবীন চৌধুরী। এক লাইনে শুধু লেখেন, বর্ণনা করার মত কোন শব্দ নেই…। আরেক অভিনেত্রী সুষমা সরকারও মেহজাবীনের মতোই একবাক্যে লেখেন, হুমায়রা হিমু, মানতে পারছি না। প্রশ্ন রেখে যোগ করেন, কেন?

অভিনেত্রী অহনা রহমান লিখেছেন, হুমায়রা হিমু শান্তিতে বিশ্রাম প্রিয়। আমি তোমাকে ভালোবাসি। সঙ্গে একটি লাভ ইমোজি যুগ করেন এই অভিনেত্রী। হুমায়রা হিমুর মৃত্যুরে জনপ্রিয় অভিনেত্রী মনিরা মিঠু সহ তার অন‍্যান‍্য সহশিল্পীরা শোকে কাতর।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Kishori
সংবাদ প্রতিনিধি

Kishori

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।