ড. ইউনূসকে হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড প্রদান, সম্মান জানালেন ৪০০ অতিথি

ড. ইউনূসকে হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড প্রদান, সম্মান জানালেন ৪০০ অতিথি
ড. ইউনূসকে হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড প্রদান, সম্মান জানালেন ৪০০ অতিথি

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতার হাতে পুরস্কার তুলে দেন হিলারি ক্লিনটন

শান্তিতে নোবেলজয়ী ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে মর্যাদাপূর্ণ ‘হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্টন হলরুমে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অনুষ্ঠানে প্রায় ২৫টি দেশের রাষ্ট্রদূত, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, গবেষকসহ প্রায় ৪০০ অতিথি অংশ নেন। ড. ইউনূসের নাম ঘোষণা করা হলে উপস্থিত অতিথিরা দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ করতালি দিয়ে তাঁকে সম্মান জানান।

এ বছর ড. ইউনূসসহ মোট চারজনকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। অন্য পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন ভারতের সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন (সেবা)-এর পরিচালক রিমা নানাবতী, ফ্যাশন ডিজাইনার ও টোরি বার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা টোরি বার্চ এবং জর্ডানের মাইক্রোফান্ড ফর উইমেনের বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতিয়ান। মুনা সুখতিয়ানকে বিশেষ ‘জর্জটাউন অ্যাম্বাসেডরস অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।

গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের প্রশংসা হিলারি ক্লিনটনের

অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসের কাজের প্রশংসা করে হিলারি ক্লিনটন বলেন, তিনি নিজে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম দেখেছেন। এই ব্যাংকের মাধ্যমে নারীরা কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এবং ক্ষমতায়িত হয়েছেন, তা অভূতপূর্ব।

তিনি আরও বলেন, ড. ইউনূসের উদ্যোগ শুধু বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তাঁর কাজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।

ক্ষুদ্রঋণে নারীর ক্ষমতায়নের কথা তুলে ধরলেন ইউনূস

পুরস্কার গ্রহণের পর বক্তব্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের ৫০ বছরের স্বীকৃতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ আয়োজন বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেবে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের পরিবারগুলোকে অনুপ্রাণিত করবে।

দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষকে স্বাবলম্বী করে তুলতে তাঁরা ক্ষুদ্রঋণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে নারীদের নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগানো, দায়িত্ব গ্রহণ এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে উৎসাহিত করা হয়েছে।

ড. ইউনূস বলেন, সময়ের সঙ্গে এসব পরিবারের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেসব নারী নিজেদের সমস্যা বা প্রয়োজনের কথা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করতেন, এখন তাঁরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের দাবি তুলে ধরছেন। গ্রামীণ ব্যাংকের নারী ঋণগ্রহীতারা নিজেদের ব্যাংক পরিচালনা করছেন এবং তাঁরাই এ ব্যাংকের মালিক।

চাকরিপ্রার্থী নয়, চাকরিদাতা হওয়ার আহ্বান

ঋণগ্রহীতাদের সন্তানদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, তরুণদের শুধু চাকরি খোঁজার চিন্তায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাঁদের উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা চাকরিপ্রার্থী নই, আমরা চাকরিদাতা।’ তাঁর মতে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে নিজেদের উদ্যোগে ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

সামাজিক ব্যবসায় স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন

বক্তব্যে সামাজিক ব্যবসার ধারণাও তুলে ধরেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, সামাজিক ব্যবসার মূল লক্ষ্য ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন নয়; বরং মানুষের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধান করা।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে সামাজিক ব্যবসার তহবিল ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ পুনরায় স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় চালুর আশা

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে ড. ইউনূস বলেন, প্রচলিত শিক্ষা তরুণদের চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তোলার দিকে বেশি মনোযোগী। অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের সৃজনশীলতা ও উদ্যোগী মনোভাব বিকশিত করা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দায়িত্ব শুধু সনদ দেওয়া নয়, বরং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করাও।

এ লক্ষ্য সামনে রেখে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ চালু করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

ড. ইউনূসের মতে, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ার উদ্যোগে নেতৃত্ব দিতে পারে। এই ধারণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শুধু সনদ অর্জনের পরিবর্তে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হবে। ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নসহ অন্যান্য সহযোগিতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

শিক্ষাক্ষেত্রে এ উদ্যোগকে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়বে এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।