ভারতের বিপক্ষে সিরিজ খেলেও রাজস্ব পায় না ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দায়ী ১৯৯৭?

ভারতের বিপক্ষে সিরিজ খেলেও রাজস্ব পায় না ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দায়ী ১৯৯৭?
ভারতের বিপক্ষে সিরিজ খেলেও রাজস্ব পায় না ওয়েস্ট ইন্ডিজ

ক্রিকেট মাঠে ভারতের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মাঠের বাইরের আর্থিক হিসাব-নিকাশে বড় বৈষম্যের মুখে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিকেট বাজার ভারতে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজন করে বিপুল রাজস্ব আয়ের সুযোগ পাচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। বিপরীতে, সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড এই সিরিজ থেকে কোনো রাজস্ব পায় না বলে দাবি করেছেন ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের (সিডব্লিউআই) প্রধান নির্বাহী ক্রিস ডিয়ারিং। তাঁর মতে, ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রাজস্ব বণ্টনব্যবস্থায় নেওয়া একটি সিদ্ধান্তই ক্যারিবীয় ক্রিকেটের আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ।

ভারতের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের আর্থিক সক্ষমতার পার্থক্যও আলোচনায় এসেছে। সিরিজের চতুর্থ ম্যাচে শাই হোপের দুর্দান্ত সেঞ্চুরির সুবাদে ২-২ সমতা ফেরানোর পরও ওয়েস্ট ইন্ডিজের আর্থিক দুরবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ডিয়ারিং।

এক অনুষ্ঠানে ক্যারিবীয় ক্রিকেটের আর্থিক সংকট এবং খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক কমানোর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রাজস্ব বণ্টনব্যবস্থার বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরেন।

ডিয়ারিংয়ের দাবি, ভারতে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় সিরিজ থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোনো রাজস্ব পায় না। অথচ ভারতের বিশাল দর্শক ও সম্প্রচার বাজারের কারণে স্বাগতিক বোর্ডের আয় কয়েক কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একই সিরিজে অংশ নিয়েও দুই বোর্ডের আর্থিক প্রাপ্তির মধ্যে বড় ব্যবধান থেকে যাচ্ছে।

১৯৯৭ সালের সিদ্ধান্তে বদলে যায় রাজস্ব বণ্টন

ক্রিস ডিয়ারিংয়ের মতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ১৯৯৭ সালের দিকে। ওই সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আর্থিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনার পক্ষে আইসিসির সদস্য দেশগুলো ভোট দিয়েছিল। ডিয়ারিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সিরিজের সম্প্রচারস্বত্ব থেকে অর্জিত অর্থের ওপর স্বাগতিক বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে।

তিনি জানান, আগের ব্যবস্থায় সফরকারী দলকে রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হতো স্বাগতিক বোর্ডকে। তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট দল ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় প্রতিপক্ষ। বিভিন্ন দেশ তাদের সফরে নিতে আগ্রহী থাকত এবং সফরের বিনিময়ে ক্যারিবীয় বোর্ড উল্লেখযোগ্য অর্থ পেত।

ডিয়ারিংয়ের ভাষ্য, ১৯৯৭ সালে আইসিসির ১০টি সদস্য দেশের মধ্যে ৯টি নতুন আর্থিক মডেলের পক্ষে ভোট দেয়। এর ফলে দ্বিপক্ষীয় সিরিজের সম্প্রচারস্বত্ব থেকে অর্জিত অর্থ স্বাগতিক বোর্ডের কাছে রাখার সুযোগ তৈরি হয়। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো তুলনামূলক ছোট বাজারের ক্রিকেট বোর্ডকে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপে ফেলে।

ভারতের বাজারের সঙ্গে ক্যারিবীয় অঞ্চলের তুলনা

আর্থিক বৈষম্যের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে ভারতের বিশাল জনসংখ্যা ও দর্শকবাজারের সঙ্গে অ্যান্টিগা এবং সেন্ট কিটসের মতো ক্যারিবীয় দ্বীপের তুলনা করেছেন ডিয়ারিং।

ভারতের বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে সম্প্রচারস্বত্ব বিক্রি, বিজ্ঞাপন এবং বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ আয়ের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, ক্যারিবীয় অঞ্চলের ছোট জনসংখ্যা ও সীমিত বাজারের কারণে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে একই ধরনের আয় করা কঠিন।

ডিয়ারিংয়ের মতে, ভারতের প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের বাজারের সঙ্গে অ্যান্টিগা বা সেন্ট কিটসের মতো ছোট দ্বীপের বাজারের তুলনা চলে না। ফলে স্বাগতিক হিসেবে ভারতের যে রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা থাকে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের নিজস্ব অঞ্চলে সিরিজ আয়োজন করে সেই পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা বাস্তবসম্মত নয়।

‘আয়ের প্রধান উৎস কেড়ে নেওয়া হয়েছিল’

১৯৯৭ সালের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ডিয়ারিং বলেন, আইসিসির সদস্য দেশগুলোর ভোটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৯-১ ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল। তাঁর মতে, ওই সিদ্ধান্ত ক্যারিবীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ আর্থিক সংকটের পথ তৈরি করেছিল।

তিনি মনে করেন, সফরকারী দলকে রাজস্বের অংশ দেওয়ার পুরোনো ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো বোর্ডগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি আর্থিক সুবিধা পেত। নতুন ব্যবস্থায় স্বাগতিক বোর্ডের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলেও সফরকারী দলের জন্য নিশ্চিত রাজস্বের পথ সংকুচিত হয়ে যায়।

ডিয়ারিংয়ের বক্তব্যে স্পষ্ট, ওয়েস্ট ইন্ডিজের আর্থিক সংকটের পেছনে শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাণিজ্যিক কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক, ক্রিকেট পরিচালনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নে পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় করতে ক্যারিবীয় বোর্ডকে যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে, তার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি এই রাজস্ব বণ্টনব্যবস্থাকে দেখছেন।

তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আর্থিক কাঠামো নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ওয়েস্ট ইন্ডিজের আয় বাড়াতে সম্প্রচারস্বত্ব, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব এবং আইসিসির রাজস্ব বণ্টনব্যবস্থায় সংস্কারের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

ক্রীড়া ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।