একজন শিক্ষক ১৯৫৫ সাল থেকে পড়িয়েছেন, লিখেছেন নিজের এলাকার ইতিহাস। একজন মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালে সম্মুখযুদ্ধে পায়ে গুলি খেয়েছেন। একজন চাকরি না পেয়ে গ্রামে গ্রামে শাঁখা বিক্রি করেছেন, পরে সবজি চাষ করে পুরো গ্রামকে পথ দেখিয়েছেন। এই মানুষদের সম্মানে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে শনিবার (৩১ অক্টোবর) বসেছিল ‘নক্ষত্রের অভিবাদন’।
‘গুণীজনের আলোয় আলোকিত হোক সমাজ’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাব। সাহিত্য, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, মুক্তিযুদ্ধ, জনসেবা, কৃষি, ক্রীড়া, সংগীত ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদান রাখায় গুণীজনদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে মেধা ও মননের স্বাক্ষর রাখা কয়েকজন ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীকেও সম্মাননা জানানো হয়।
শ্যামনগর উপজেলা অডিটোরিয়াম হলে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলে প্রথম পর্ব, অর্থাৎ গুণীজন সংবর্ধনা ও আলোচনা সভা। এরপর একই স্থানে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব, গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী জারি গান ও সাংস্কৃতকি অনুষ্ঠান।
প্রেসক্লাবের সভাপতি সামিউল মনিরের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান লিটনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক। বিশেষ অতিথি ছিলেন শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সোলায়মান কবীর, উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির সহকারী অধ্যাপক ফজলুল হক, সাতক্ষীরার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জি এবং শ্যামনগর সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ লিয়াকত আলী বাবু। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সাহিত্যে অবদানের জন্য সংবর্ধনা পান অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. কেরামত উল্লাহ। ১৯৩৫ সালে জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষ নকিপুর জমিদারবাড়ির পাঠশালায় শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর ১৯৫৫ সালে শিক্ষকতায় যোগ দেন। লিখেছেন ছড়া, কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ। তাঁর বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘লাল সংকেত’, ‘স্রোতস্বিনী’, ‘শ্যামনগরের ইতিহাস’ ও ‘শ্যামনগরের দর্পণ’।
শিক্ষায় অবদানের জন্য সংবর্ধিত হন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক স্বপন কুমার মুখার্জি। নকিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০ বছর ও হায়বাতপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৬ বছর শিক্ষকতা করেছেন তিনি। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধেও ভূমিকা রেখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য সংবর্ধনা পান বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম মিজানুর রহমান। ১৯৭১ সালে শ্যামনগরে তিনি ছিলেন যুদ্ধকালীন ইউনিট কমান্ডার। সম্মুখযুদ্ধে পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার প্রথম ইউএনও এবং ১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর পরিচালক ছিলেন।
কৃষিতে স্বীকৃতি পেয়েছেন মনোতোষ মণ্ডল। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও চাকরি না পেয়ে একসময় গ্রামে গ্রামে শাঁখা বিক্রি করতেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে মাত্র ১৫ শতক জমিতে পুকুর খনন ও নিচু জমি ভরাট করে সবজি চাষ শুরু করেন। তাঁর দেখানো পথে হাটছালা গ্রামের অন্য কৃষকেরাও এখন স্থানীয় হাটবাজারের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সবজি সরবরাহ করছেন।
শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় সংবর্ধিত হন আলহাজ মো. আরশাদ আলী মোড়ল। ১৯৭০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত রমজাননগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। পাতড়াখোলা আরশাদ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ভৈরবনগর দারুল উলুম বালিকা দাখিল মাদ্রাসা ও রমজাননগর ইউনিয়ন তোফাজ্জল বিদ্যাপীঠসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ায় ভূমিকা রেখেছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দান করেছেন। ৮১ বছর বয়সেও সপ্তাহে তিন-চার দিন এসব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে খোঁজখবর নেন তিনি।
সমাজসেবায় সংবর্ধনা পান আলহাজ আবুল কালাম বাবলা। আইলা, সিডরসহ বিভিন্ন দুর্যোগে উপকূলীয় এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। প্রচারের আড়ালে থেকে কাজ করাই তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ক্রীড়ায় সংবর্ধিত হন এস এম ফিরোজ হোসেন। ১৯৭৫ সালে সাতক্ষীরা পিকে ক্লাবে খেলা শুরু করে পরে খুলনা শিপইয়ার্ড ও ঢাকা সাধারণ বীমা ক্লাবেও খেলেছেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মরণোত্তর সংবর্ধনা ও সম্মাননা দেওয়া হয় তিনজনকে। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য সংবর্ধনা পান ১৯৮৫ সালে শ্যামনগর প্রেসক্লাবের সভাপতি আনোয়ার হোসেন মল্লিক, যিনি সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানের জন্য স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন।
জনসেবায় সম্মাননা দেওয়া হয় বাবু বিশ্বনাথ দাসকে, যিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে সদর ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ নানা উন্নয়নকাজে ভূমিকা রেখেছেন এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে প্রতিবাদী ছিলেন। সংগীতে সংবর্ধনা পান গীতিকার ও সুরকার অনিমেষ ব্যানার্জি। কলকাতায় পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জির কাছে সেতার শিখেছিলেন তিনি। খুলনা বেতারে প্রচারিত হয়েছে তাঁর লেখা ও সুর করা অনেক গান।
ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ আশরাফিয়া দাওরা হাদিস মাদ্রাসায় অর্ধশতাব্দী ধরে নিবেদিতভাবে দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ সংবর্ধনা পান হাফেজ মো. আব্দুল আলী। সম্মাননা দেওয়া হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ ও মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক জিহাদ আলীকেও।
নতুন প্রজন্মকেও সম্মান জানানো হয় অনুষ্ঠানে। একাগ্রতা, মেধা ও মননের সমন্বয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য বিশেষ সম্মাননা পান সাথী মুন্ডা, শারমীন আক্তার, খাদিজা খাতুন, রেহানা খাতুন, আসাদুল মোল্যা, আমীর হোসেন, কামরুজ্জামান, মো. মাসুম বিল্লাহ, আনিকা তাবাসসুম, জেবা তাসনিয়া, হাফেজ মুহাম্মদ রিয়াসাত আলী ও হাফিজুর রহমান (হাফিজ)। শ্যামনগর মডার্ন স্কুলের ১০ জন শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বই উপহার।
গুণীজনদের সম্মাননার পাশাপাশি প্রেসক্লাবের সংবাদকর্মীদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মূল্যায়ন করা হয়। মূল্যায়নে সম্মাননা প্রাপ্ত হন প্রেসক্লাবের সামিউল আযম মনির, রনজিৎ বর্মন, জি এম মনিরুজ্জামান, শাহাজান সিরাজ, মাহমুদুল ফিরোজ বকুল।
অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয় প্রেসক্লাবের নিজস্ব ম্যাগাজিন ‘আত্মপ্রকাশ’। আয়োজকেরা মনে করছেন, স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা ব্যক্তিদের কর্ম ও জীবনের কথা নতুন প্রজন্মকে জানাতে এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





