রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি, বাঙালির সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি অসম্মান নিয়ে বিতর্ক

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি, বাঙালির সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি অসম্মান নিয়ে বিতর্ক
রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’-এর রচয়িতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গ্রাফিতিতে চুনকালি মাখানোর অভিযোগে এক যুবককে আটক করার খবর ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ঘটনাটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মতাদর্শিক অসহিষ্ণুতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা নন, তিনি বাঙালির ভাষা, সংগীত, শিল্প ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তাঁর সাহিত্যকর্ম ও সংগীত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতীয় জীবনের নানা পর্যায়ে গভীর প্রভাব রেখেছে। ফলে তাঁর প্রতিকৃতিতে অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ অনেকের কাছে শুধু একজন কবির প্রতি অসম্মান নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্বসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবিস্মরণীয় অবদান

১৮৬১ সালের ৭ মে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সংগীত ও চিত্রকলাসহ সৃজনশীলতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্য। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি অর্জন করেন।

ব্রিটিশ সরকার ১৯১৫ সালে তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। তবে ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেন। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর নৈতিক অবস্থানও ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

সাহিত্যের পাশাপাশি চিত্রকলায়ও রবীন্দ্রনাথের স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে। জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর আঁকা ছবি ইউরোপের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হয় এবং আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অর্জন করে।

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ও মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রসংগীত

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর গান ও অন্যান্য দেশাত্মবোধক সংগীত বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে শক্তিশালী করেছিল।

‘একলা চলো রে’, ‘ও আমার দেশের মাটি’ এবং ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’-এর মতো গান বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে আজও বিশেষভাবে স্থান করে আছে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম দেশপ্রেম, মানবতা, প্রকৃতিপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার নানা দিক তুলে ধরে।

ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’-এর রচয়িতাও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও তাঁর অবদান তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা দাবি প্রচারিত হয়েছে। ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন—এমন একটি দাবি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। তবে এ ধরনের বক্তব্য যাচাইয়ের জন্য সমসাময়িক সংবাদপত্র, চিঠিপত্র, সভার কার্যবিবরণী এবং নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক গবেষণা পর্যালোচনা করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে ঢাকা সফর করেন এবং তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাধারা পূর্ববঙ্গের শিক্ষিত সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তাঁর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে হলে সফরের সঠিক তারিখ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ এবং সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদানের তথ্যও প্রামাণ্য সূত্রের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

ইতিহাসের কোনো ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন দাবি বা রাজনৈতিক প্রচারণার পরিবর্তে প্রামাণ্য দলিল ও গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়াই যুক্তিসংগত।

রবীন্দ্রনাথকে ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কতটা যুক্তিসংগত?

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীত বাংলা ভাষাভাষী মানুষের বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তাঁর রচনায় মানবপ্রেম, প্রকৃতি, স্বাধীনতা, সাম্য, আধ্যাত্মিকতা ও বিশ্বমানবতার ভাবনা উঠে এসেছে। তাঁকে কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কবি হিসেবে চিহ্নিত করলে তাঁর সৃষ্টিকর্মের ব্যাপ্তি ও সর্বজনীনতা সংকুচিত হয়ে পড়ে।

রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক দাবি, বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা বা অন্য কবির সাহিত্যকর্ম আত্মসাতের অভিযোগ, প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত। তথ্যনির্ভর আলোচনা সাংস্কৃতিক বিতর্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার আহ্বান

কোনো কবি, শিল্পী কিংবা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের মতাদর্শ নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু মতপার্থক্যের প্রকাশ এবং শিল্পকর্মের অবমাননা এক বিষয় নয়। গ্রাফিতি বা প্রতিকৃতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে চুনকালি মাখানোর অভিযোগ সত্য হলে, ঘটনার প্রকৃতি ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিষয়টি তদন্ত করা যেতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণ, ইতিহাসের সঠিক তথ্য প্রচার এবং নতুন প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে তোলা সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান বজায় রাখাই একটি বহুত্ববাদী সমাজের পরিচয়। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কও সেই দায়িত্বের কথা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।