পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো, ভাষানীতি, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়ে নানা সংকট তৈরি হয়। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষার পরিণতিতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
পাকিস্তানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শুধু ধর্মীয় পরিচয় একটি বহুজাতিক ও বহুভাষিক রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে বৈষম্য রাষ্ট্রটির অভ্যন্তরীণ সংকটকে ক্রমেই গভীর করে তোলে।
পাকিস্তানের ভাষাগত বৈচিত্র্য ও উর্দু বিতর্ক
পাকিস্তান কোনো একক ভাষা বা সংস্কৃতির দেশ নয়। পাঞ্জাবি, পশতু, সিন্ধি, সারাইকি, বেলুচি, উর্দুসহ বহু ভাষায় কথা বলেন দেশটির নাগরিকেরা।
২০২৩ সালের পাকিস্তানের সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির ৩৬.৯৮ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা পাঞ্জাবি, ১৮.১৫ শতাংশের পশতু, ১৪.৩১ শতাংশের সিন্ধি, ১২ শতাংশের সারাইকি এবং ৯.২৫ শতাংশের উর্দু। অর্থাৎ উর্দু পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হলেও অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা নয়।
এই ভাষাগত বাস্তবতার মধ্যেও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন।
ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সেই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বেলুচিস্তান ও পশতুন জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রশ্ন
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বেলুচিস্তান ও পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তানে গ্যাস, খনিজ ও অন্যান্য সম্পদের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ বিরাজ করছে। সেখানে বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র সংঘাত, সামরিক অভিযান, নিখোঁজের অভিযোগ ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে পশতুন জনগোষ্ঠীরও নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন হয়েছে।
তবে এসব জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে কোনো একটি রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। তাদের মধ্যেও মতাদর্শ, রাজনৈতিক অবস্থান ও সামাজিক বাস্তবতার বৈচিত্র্য রয়েছে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১: পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দুটি অঞ্চল—পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে দেশটি গঠিত হয়। দুই অঞ্চলের মধ্যে প্রায় এক হাজার মাইল ভারতীয় ভূখণ্ডের ব্যবধান ছিল।
রাষ্ট্রের জনসংখ্যার বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করলেও প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, নীতিনির্ধারণ এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাব ছিল বেশি।
পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল পাট ও পাটজাত দ্রব্য। বিশ্বব্যাংকের ঐতিহাসিক গবেষণা অনুযায়ী, ষাটের দশকের শেষভাগে পূর্ব পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসত পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে।
কিন্তু এই রপ্তানি আয়ের বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন ব্যয়, শিল্পায়ন, অবকাঠামো এবং মাথাপিছু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগ ছিল। অর্থনীতিবিদদের গবেষণায়ও দুই অঞ্চলের মধ্যে আয় ও সম্পদ বণ্টনের অসমতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অভিযোগ ছিল, তাদের উৎপাদিত সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়নের সুফল সমানভাবে তাদের কাছে পৌঁছায়নি।
এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হওয়ায় বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী তাদের সরকার গঠনের অধিকার ছিল।
কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ এবং ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তোলে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর শুরু হয় গণহত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির এক ভয়াবহ অধ্যায়।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৯৩ হাজার সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আত্মসমর্পণের তথ্য বহুলভাবে উল্লেখ করা হয়।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে সামরিক বাহিনীর প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান, ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হক এবং ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৫১ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ১৯৭৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ১৯৭৯ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ২০০৭ সালে আততায়ীর হামলায় নিহত হন।
এসব ঘটনা পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বেসামরিক শাসনের ওপর সামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল মুসলিম পরিচয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেশটির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ক্ষমতা, আঞ্চলিক স্বার্থ, জাতিগত পরিচয় এবং অর্থনৈতিক সম্পদ বণ্টন নিয়ে বিরোধ দূর হয়নি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও প্রমাণ করেছে, অভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় থাকলেই একটি রাষ্ট্রের সব জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত হয় না।
রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সম্মতি, ভাষার মর্যাদা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, গণতন্ত্র এবং ন্যায়সংগত সম্পদ বণ্টন অপরিহার্য।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক: ইতিহাস ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ থাকতে পারে, কিন্তু ১৯৭১ সালের ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের প্রশ্ন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে পাকিস্তানের উচিত ১৯৭১ সালের গণহত্যা ও নির্যাতনের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা, অমীমাংসিত ঐতিহাসিক বিষয়গুলোর সমাধানে আন্তরিক উদ্যোগ এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা করা।
ক্রিকেট কিংবা অন্য কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়ার চেয়ে ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মানুষের নির্যাতন সহ্য করা এবং দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত এই রাষ্ট্র।
তাই পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত আত্মমর্যাদা, জাতীয় স্বার্থ ও ইতিহাসের সত্যের ভিত্তিতে। বন্ধুত্ব হতে পারে, সহযোগিতাও হতে পারে; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে গিয়ে নয়।





