সাত সদস্যের পরিবার। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ষাটোর্ধ্ব তৈয়ব আলী পেশায় একজন দিনমজুর। সংসারের খরচ জোগাতে কাজের সন্ধানে তাঁকে প্রায়ই ছুটতে হয় দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করে যা আয় করেন, তা দিয়েই চলে সংসার। কষ্টার্জিত অর্থে গড়ে তুলেছেন মাত্র ছয় শতক জমির ওপর ছোট্ট একটি বসতভিটা। কিন্তু সেই ভিটাতেও এখন নিরাপদে বসবাস করতে পারছেন না তাঁর পরিবারের সদস্যরা। কারণ, বসতঘরের ওপর হেলে রয়েছে শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিতে থাকা বিশালাকৃতির দুটি কড়ইগাছ।
সামান্য বাতাস কিংবা বৃষ্টি হলেই গাছ দুটি ভেঙে ঘরের ওপর পড়ার আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে হয় পরিবারের সদস্যদের। এভাবেই প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে হাওয়া বেগমের।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার তালুক শিমুলবাড়ী গ্রামের শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই হাওয়া বেগমের বাড়ি। তিনি ওই এলাকার দিনমজুর তৈয়ব আলীর স্ত্রী। স্বামী কাজের প্রয়োজনে বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকায় ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে বাড়িতে বসবাস করেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বসতবাড়ির পাশেই শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিতে বেড়ে ওঠা কড়ইগাছ দুটি বর্তমানে ঘরের দিকে হেলে পড়েছে। গাছ দুটির ডালপালা প্রায়ই ভেঙে ঘরের ওপর পড়ে। এতে কখনো ঘরের টিনের চাল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আবার কখনো ভেঙে যাচ্ছে ঘরের কাঠামো। ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামত করে কোনো রকমে বসবাস করছে পরিবারটি। তবে গাছ দুটি ক্রমেই ঘরের দিকে হেলে পড়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
প্রতিবেশী হাবিবুর রহমান বলেন, তৈয়ব আলী অত্যন্ত দরিদ্র ও অসহায় একজন মানুষ। অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে অনেক কষ্টে বসতভিটাটুকু গড়ে তুলেছেন। অথচ শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিতে থাকা দুটি বিশাল কড়ইগাছের কারণে পরিবারটি সব সময় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
প্রায়ই গাছের ডালপালা ভেঙে ঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরের চাল ও কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিবারটি সেগুলো মেরামত করে কোনোরকমে বসবাস করছে। কিন্তু গাছ দুটি যেভাবে ঘরের দিকে হেলে আছে, তাতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই গাছ দুটি অপসারণ করা জরুরি।
হাওয়া বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী গরিব মানুষ। দিনমজুরি করে সংসার চালান। অনেক কষ্টে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছি। কিন্তু ভয়ে ঘরে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। কড়ইগাছ দুটি যেভাবে ঘরের ওপর হেলে আছে, তাতে কখন যে ভেঙে পড়ে সেই আতঙ্কে থাকি।
একটু বৃষ্টি কিংবা বাতাস হলেই ছোট ছোট নাতি-নাতনি ও ছেলের বউকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। বেশি সময় ধরে বৃষ্টি বা বাতাস হলে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। সারাক্ষণ গাছের নিচে চাপা পড়ার ভয় কাজ করে। এভাবে আর কত দিন থাকব? গাছ দুটি সরিয়ে দিলে অন্তত এই আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতাম।’
এ বিষয়ে শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর তৈয়ব আলী ও তাঁর স্ত্রী মৌখিকভাবে তাঁদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
বিষয়টি জানার পর বিদ্যালয় এর প্রধান শিক্ষকের সাথে আলাপ আলোচনা করে সরেজমিনে গিয়ে গাছ দুটির ঝুঁকিপূর্ণ কিছু ডালপালা কেটে দিয়েছি। তবে এরপরও গাছ দুটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। গাছ দুটি অপসারণের বিষয়ে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করব।’
দরিদ্র দিনমজুর তৈয়ব আলীর পরিবারের একমাত্র আশ্রয়স্থল এই ছোট্ট বসতভিটা। অথচ সেই ঘরেই নিরাপদে থাকার নিশ্চয়তা নেই তাঁদের।
অন্যদিকে, গাছ দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিতে থাকায় সেগুলো অপসারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। তাই সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে এবং পরিবারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।





