আজ ৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস। মানবতা, সহমর্মিতা, পরোপকার এবং সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেতনাকে উৎসাহিত করাই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবস মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই সমাজ গঠনে মানবিক সহায়তা ও দাতব্য কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব অপরিসীম।
দাতব্য বলতে সাধারণত কোনো ব্যক্তিগত লাভ বা প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই অন্যের কল্যাণে অর্থ, সম্পদ, সময়, শ্রম কিংবা সেবা দেওয়াকে বোঝায়। তবে দাতব্য কেবল অর্থ বা সামগ্রী দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অসহায় মানুষের কষ্ট লাঘব, দুর্যোগে সহযোগিতা, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা, খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা কিংবা স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমেও মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব।
আরও পড়ুনঃ আজ ৫ আগস্ট (১৮ ভাদ্র ) শনিবারের দিনপঞ্জি ও ইতিহাসের এইদিনে
যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মতো সংকটের সময়ে দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবীরা মানুষের জীবন রক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের মাধ্যমেও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা হয়।
যেভাবে শুরু আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস
আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস পালনের উদ্যোগ প্রথমে হাঙ্গেরি থেকে আসে। ২০১১ সালে হাঙ্গেরি সরকার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ দিবস পালনের প্রস্তাব দেয়। পরে ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
৫ সেপ্টেম্বর দিনটি বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে মানবসেবার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। ১৯৯৭ সালের এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মানবতাবাদী মাদার তেরেসা। কলকাতায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’ দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের সেবায় কাজ করেছে।
আরও পড়ুনঃ আজ আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস: মানবতার সেবায় নিঃস্বার্থ দানের আহ্বান
মানবকল্যাণে অসামান্য অবদানের জন্য মাদার তেরেসা ১৯৭৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর জীবন ও কর্ম নিঃস্বার্থ মানবসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতেও ৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
দাতব্য কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত পরিধি
বর্তমান বিশ্বে দাতব্য কার্যক্রমের পরিধি অনেক বিস্তৃত। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং দুর্যোগকবলিত মানুষের পুনর্বাসন—সবই এর আওতাভুক্ত।
ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে এ কাজে অংশ নিতে পারে। অর্থ সহায়তার পাশাপাশি খাদ্য, পোশাক, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ, স্বেচ্ছাশ্রম, রক্তদান, চিকিৎসাসেবা, আইনি সহায়তা কিংবা শিক্ষাসেবাও দাতব্য কর্মকাণ্ডের অংশ হতে পারে।
কিছু প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি স্কুল, হাসপাতাল, এতিমখানা, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও পুনর্বাসন প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ মানুষের আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে।
ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধে দাতব্য
বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে দান, পরোপকার ও মানুষের সেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামে যাকাত ফরজ এবং সদকা একটি গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল। হিন্দুধর্মে দান ও পরোপকারকে নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। একইভাবে খ্রিস্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্মেও দরিদ্র, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ কারণে দাতব্য কর্মকাণ্ড শুধু অর্থনৈতিক সহায়তার বিষয় নয়; এটি মানুষের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সহমর্মিতারও প্রকাশ।
বিশ্বজুড়ে মানবসেবায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য দাতব্য ও মানবিক প্রতিষ্ঠান শিক্ষা, চিকিৎসা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমে কাজ করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যুদ্ধ, দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আন্তর্জাতিক কমিটি অব দ্য রেড ক্রস, ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস, ওয়ার্ল্ড ভিশন, ইসলামিক রিলিফসহ বিভিন্ন সংস্থা বিশ্বের সংকটপূর্ণ অঞ্চলে মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম খাদ্য সহায়তা ও ক্ষুধা মোকাবিলায় কাজ করছে। পাশাপাশি ইউনিসেফ শিশুদের কল্যাণ এবং ইউএনএইচসিআর শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশেও রয়েছে মানবসেবার দীর্ঘ ঐতিহ্য
বাংলাদেশে দাতব্য ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্রঋণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।
ব্র্যাক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য বিমোচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ক্যারিতাস বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলা, পুনর্বাসন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করে। জাগো ফাউন্ডেশন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন নিয়মিতভাবে ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা সহায়তা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ব্যক্তি পর্যায়েও সম্ভব মানবসেবা
দাতব্য কাজের জন্য বড় কোনো প্রতিষ্ঠান বা বিপুল অর্থের প্রয়োজন নেই। একজন মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারেন। কাউকে খাবার দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসায় সহায়তা করা, শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া, রক্তদান করা, স্বেচ্ছাশ্রম দেওয়া কিংবা দুর্যোগের সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়াও মানবিক দাতব্য কর্মকাণ্ডের অংশ।
অনেক সময় অর্থের চেয়ে সময়, শ্রম ও সহমর্মিতাই মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সংকটের বিশ্বে দাতব্যের গুরুত্ব
যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বাস্তুচ্যুতির মতো বৈশ্বিক সংকটের কারণে বর্তমানে মানবিক সহায়তার প্রয়োজন আরও বেড়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। দান মানেই শুধু অর্থ দেওয়া নয়—সময়, শ্রম, জ্ঞান, দক্ষতা ও ভালোবাসা দিয়েও মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়।
মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখা সম্ভব। তাই দানের পরিমাণ নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই হোক সবচেয়ে বড় বিষয়। পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে উঠতে পারে আরও মানবিক, শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর একটি বিশ্ব।



