দুর্গম কয়রায় চিকিৎসার সংকট, ভাসমান হাসপাতালে স্বস্তি

দুর্গম কয়রায় চিকিৎসার সংকট, ভাসমান হাসপাতালে স্বস্তি
ভাসমান হাসপাতালে স্বস্তি
ভোর না হতেই সুন্দরবনের পাশে শাকবাড়িয়া নদীতে নোঙর করা হাসপাতালের সামনে মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন পরিবারের সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে, কেউ একাই। কেউ কয়রা সদর থেকে, কেউ এসেছেন উপজেলার দূরের কোনো গ্রাম থেকে। চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ—সবই বিনামূল্যে পাওয়া যাবে, এমন আশায় ভোর থেকেই সিরিয়াল দিতে শুরু করেন তাঁরা।
খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের নয়নি গ্রামে নোঙর করা ‘কিং আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ’ ভাসমান হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের সামনে রোগীর সারি দীর্ঘ হতে থাকে। ফ্রেন্ডশিপ এনজিও’র তত্ত্বাবধানে এলাকার শত রোগীদের প্রতিদিন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ানহচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা স্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা গ্রামের বাসিন্দা জাহানারা পারভীন তাঁর পরিবারের কয়েকজনকে নিয়ে এসেছেন চিকিৎসা নিতে। তিনি বলেন, “এখানে ভালো চিকিৎসা হয়—এমন কথা শুনেছি। তাই পরিবারের আরও কয়েকজনকে নিয়ে এসেছি।”
উপজেলার বাগালী  ইউনিয়নের বামিয়া গ্রামের লতিকা ঘোড়ামী নামে একজন বয়স্ক রোগী বলেন, চিকিৎসা ও ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে শুনে তিনি হাসপাতালে এসেছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধও পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালে সাধারণ রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি দাঁত ও চোখের চিকিৎসা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ছোটখাটো অস্ত্রোপচারও করা হচ্ছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
ভাসমান হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ১৭০ থেকে ১৮০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। গত ১৫ জুলাই মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের নয়নি গ্রামে হাসপাতালটি নোঙর করা হয়। এখানে একজন মেডিকেল অফিসার, দুজন সহকারী, চারজন টেকনোলজিস্ট, একজন ফার্মাসিস্টসহ মোট ২২ জন কর্মী কাজ করছেন।
ফ্রেন্ডশিপের প্রজেক্ট ম্যানেজার ফিরোজ আক্তার বলেন, হাসপাতালটি এখানে তিন থেকে চার মাস অবস্থান করবে। এ সময় কয়রা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালটি যতদিন এলাকায় থাকবে, ততদিন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে।
এলাকার জলবায়ু, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করা সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভের প্রধান সমন্বয়ক ও সাংবাদিক তারিক লিটু বলেন, “সুন্দরবনবেষ্টিত কয়রার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা পাওয়া এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। উপজেলা সদরের হাসপাতালও অনেকের জন্য দূরের পথ। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মানুষ সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেন না। এর ওপর জেলা হাসপাতাল উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৩১ কিলোমিটার দূরে। প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে ভাসমান হাসপাতালের মাধ্যমে এসব এলাকায় সারা বছর নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালু রাখা গেলে স্বাস্থ্যসেবার সংকট অনেকটাই কমবে। এতে দুর্গম এলাকার মানুষও সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর ঝুঁকি কমবে।”
উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ শিকারী বলেন , উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় কয়রার অনেক মানুষের জন্য নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পাওয়া সহজ নয়। এ অবস্থায় কয়েক মাসের জন্য হলেও ভাসমান হাসপাতালের সেবা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হাসপাতালটি আরও কিছুদিন এলাকায় থাকলে প্রত্যন্ত গ্রামের আরও মানুষ চিকিৎসাসেবার আওতায় আসবেন বলে আশা করছেন তিনি।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।