একনেকে ৫৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন, তিতাসে খনন হবে দুটি গ্যাসকূপ

একনেকে ৫৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন, তিতাসে খনন হবে দুটি গ্যাসকূপ
একনেকে ৫৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন, তিতাসে খনন হবে দুটি গ্যাসকূপ

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খননের জন্য ৫৯২ কোটি টাকার প্রকল্প রয়েছে। কূপ দুটি চালু হলে দৈনিক প্রায় ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বুধবার (৪ নভেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ষষ্ঠ একনেক সভায় প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়।

অনুমোদিত ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে ১১টি নতুন এবং দুটি সংশোধিত। এসব প্রকল্পে সরকারি তহবিল থেকে ৫০ হাজার ৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা, সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৭৩ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ৭ হাজার ৯৭৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

সভা শেষে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি।

তিতাসে ৫৯২ কোটি টাকায় দুটি গ্যাসকূপ খনন

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৩ কোটি ঘনফুট বাড়ানোর লক্ষ্যে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামে দুটি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন করা হবে। এ জন্য ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীন পেট্রোবাংলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হবে।

দেশের গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এরপর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য রয়েছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিতাসের নতুন দুটি কূপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, কূপ দুটি থেকে ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যেতে পারে। কোম্পানির বর্তমান কূপমুখের দামে এসব গ্যাস ও কনডেনসেটের আনুমানিক মূল্য ৩৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্যাসের মূল্য ২৮৫ কোটি ২৬ লাখ এবং কনডেনসেটের মূল্য ৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, ভোক্তা পর্যায়ের গ্যাসের দাম বিবেচনায় ১০ বছরে উৎপাদিত গ্যাসের আনুমানিক মূল্য দাঁড়াবে ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

বিজিএফসিএল বর্তমানে তাদের পরিচালনাধীন ছয়টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৮০ থেকে ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র তিতাসে খনন করা ২৮টি কূপের মধ্যে ২৩টি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে।

২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ কাজে বিজিএফসিএল চীনের ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (সিএনপিসি) প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেডকে দায়িত্ব দেয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি ১৬টি ইনফিল কূপ এবং সাতটি গভীর কূপ খননের সুপারিশ করে।

প্রকল্পের আওতায় বিদেশি ঠিকাদারের মাধ্যমে দুটি কূপ খনন, দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ এবং গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় কাজ করা হবে। ২০২৬ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে।

পরিকল্পনা কমিশনের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়বে, শিল্প খাতের বিকাশে সহায়তা করবে এবং এলএনজি আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

গত ১৮ জুন ২০২৬ অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পের ব্যয় যৌক্তিকীকরণের সুপারিশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক ব্যয় ৬৩২ কোটি টাকা থেকে ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে ৫৯২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যান্য যেসব প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে

একনেক সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি এবং প্রতিরক্ষা, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একটি করে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার প্রকল্প। বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় খাল পুনঃখনন এবং নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৭৩০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার আরেকটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ইনোভেশন ফর ক্লাইমেট-স্মার্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট’, ২ হাজার ৫৬৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (এসআইডিপি) এবং ৩ হাজার ৯৫১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩-এর তৃতীয় সংশোধন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষায়িত ও অপারেশনাল যানবাহন কেনার দুটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোড আবাসিক এলাকায় বি-টাইপ কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় হবে ১৭৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় রাজধানীর জিগাতলার গাবতলা কলোনিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করবে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ কোটি ১১ লাখ টাকা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন দেশের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট (ইনমাস) স্থাপন করা হবে। এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন পেয়েছে।

এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ সড়কে ১৫ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পটি তৃতীয়বারের মতো সংশোধন করা হয়েছে। এ পর্যায়ে প্রকল্পটির ব্যয় ৫২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও পাঁচ প্রকল্প অনুমোদন

একনেক সভায় জানানো হয়, ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও পাঁচটি প্রকল্প ইতোমধ্যে পরিকল্পনামন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। প্রকল্পগুলো হলো দিনাজপুরের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটে হৃদ্‌রোগ চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়ন; শিশু, কিশোর-কিশোরী ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করা; ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় যান চলাচলের অবকাঠামো ও সড়ক নিরাপত্তার উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম সংশোধন; ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের প্রথম সংশোধন এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে আধুনিক যানবাহন ও সরঞ্জাম কেনা।

সভায় মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।