ধানমন্ডিতে দুর্গার শৈল্পিক রূপে প্রতিবাদের ভাষা, রবীন্দ্রসংগীতে শুরু ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী

ধানমন্ডিতে দুর্গার শৈল্পিক রূপে প্রতিবাদের ভাষা, রবীন্দ্রসংগীতে শুরু ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী
ধানমন্ডিতে দুর্গার শৈল্পিক রূপে প্রতিবাদের ভাষা

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যখন ধর্মীয় পরিচয়, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তখন রাজধানীর ধানমন্ডিতে অনুষ্ঠিত একটি ব্যতিক্রমী শিল্প আয়োজন নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেবী দুর্গার চিরাচরিত ধর্মীয় অবয়বের বাইরে গিয়ে তাঁকে মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং মৌলবাদী চিন্তার প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন শিল্পীরা।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লেপনের ঘটনা এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুর মাংস খাওয়া ও গরু জবাইকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রেক্ষাপটে ধানমন্ডির এই আয়োজনকে অনেকে ভিন্ন সাংস্কৃতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। তবে পৃথক ঘটনাগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে, এমন দাবি করার মতো স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি।

দেবী দুর্গাকে এমন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে, এই ‘শিল্পীর চোখে দুর্গা’ শীর্ষক বিশেষ শিল্প প্রদর্শনী। ৯ অক্টোবর শুরু হওয়া চার দিনের এ আয়োজন চলবে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে প্রদর্শনী।

রবীন্দ্রসংগীতে সূচনা, দুর্গার নতুন শিল্পভাষা

শক্তি শিল্পযাত্রা ও বিশ্বরঙের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত প্রদর্শনীর সূচনা হয় রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়ে। আয়োজনে অংশ নেওয়া শিল্পীরা দেবী দুর্গার পরিচিত প্রতিমারূপের পাশাপাশি তাঁর শক্তি, সাহস, সংগ্রাম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তাৎপর্যকে শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করেন।

এখানে দুর্গা কেবল পূজার মণ্ডপে অধিষ্ঠিত দেবী নন; বরং অন্যায়, বৈষম্য ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধী চেতনার প্রতীক। শিল্পীদের সৃজনশীল উপস্থাপনায় সেই চিরন্তন শক্তির সমকালীন ব্যাখ্যা ফুটে উঠেছে।

পোশাক, সংগীত ও শিল্পে বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতিফলন

প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের পোশাক, সাজসজ্জা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশেও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নান্দনিকতার ছাপ দেখা যায় বলে আয়োজনে উপস্থিত পর্যবেক্ষকেরা উল্লেখ করেছেন। শাড়ি, উত্তরীয় ও উৎসবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রঙের ব্যবহার আয়োজনটিকে দিয়েছে বিশেষ মাত্রা।

রবীন্দ্রসংগীত, চিত্রকলা ও দুর্গার প্রতীকী উপস্থাপনা মিলিয়ে প্রদর্শনীটি হয়ে ওঠে শিল্পের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রকাশের একটি ক্ষেত্র। পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে শিল্পীদের অবস্থান নির্ধারণ না করে, তাঁদের সৃষ্টিশীল কাজের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত বক্তব্যকে মূল্যায়ন করাই এ ধরনের আয়োজনের মূল তাৎপর্য।

মৌলবাদ ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে শিল্পের প্রতিবাদ

দেবী দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়। সেই পৌরাণিক ভাবনাকে সমকালীন সমাজের অন্যায়, অসহিষ্ণুতা ও মানুষের স্বাধীন চিন্তার পথে বাধার বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে প্রদর্শনীতে।

শিল্পের শক্তি এখানেই—সরাসরি সংঘাতের পথে না গিয়েও চিত্রকলা, সংগীত, পোশাক ও প্রতীকের মাধ্যমে সমাজের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়। মানুষের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার প্রয়োজনীয়তাও এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সামনে আসে।

প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের মোট ৬০ জন অভিনয় ও চিত্রশিল্পী অংশ নিয়েছেন বলে আয়োজক-সংশ্লিষ্ট বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের পরিচয়, প্রদর্শিত শিল্পকর্মের তালিকা ও আয়োজনের আনুষ্ঠানিক বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

দুর্গোৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্যের বাইরেও দেবীর প্রতীকী শক্তি

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গাপূজা ধর্মীয় বিশ্বাস, ভক্তি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। দেবী দুর্গার অসুরবধের কাহিনি দীর্ঘকাল ধরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, অশুভের বিরুদ্ধে শুভ এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

এই ধর্মীয় আখ্যানকে শিল্পীরা যখন সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেন, তখন তা নতুন ব্যঞ্জনা লাভ করে। দেবীর রুদ্রমূর্তি হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা; তাঁর শক্তির ধারণা অনুপ্রেরণা দেয় সাহস, আত্মমর্যাদা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।

বহুত্ববাদী সমাজে শিল্পের স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্ন

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নানা ধর্ম, ভাষা, বিশ্বাস ও শিল্পধারার সম্মিলনে সমৃদ্ধ। তাই কোনও শিল্পকর্মের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার শৈল্পিক মান, বক্তব্য ও সাংস্কৃতিক অবদানের ভিত্তিতে—শিল্পীর ধর্মীয় পরিচয় কিংবা পোশাকের ভিত্তিতে নয়।

একই সঙ্গে কোনও সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ঘিরে সম্ভাব্য হুমকি বা নির্যাতনের আশঙ্কা প্রকাশ করা হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা জরুরি। শিল্পীদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সব সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষা করা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

ধানমন্ডির এই আয়োজনের তাৎপর্য তাই শুধু দুর্গার ভিন্নধর্মী শিল্পরূপে সীমাবদ্ধ নয়। শিল্প, সংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে মানুষের শক্তি, প্রতিবাদ এবং সহাবস্থানের বার্তা তুলে ধরাও এর গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

সংস্কৃতি প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।