রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে

সিলেট প্রতিনিধি: অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সংশ্লিষ্টতা দেখে তাকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিলেটের সার্কিট হাউস মিলনায়তনে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে মঙ্গলবার তিনি এসব কথা বলেন।

অপরাধীদের নির্মোহ তালিকার নির্দেশ

সিলেট অঞ্চলের সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও চোরাচালানিদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে অনেক অপরাধীর পরিচয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের জানা রয়েছে। তবে তালিকা তৈরির সময় কোনো নিরীহ ব্যক্তিকে রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। একইভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো প্রকৃত অপরাধীকেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।

আরও পড়ুনঃ ৪২ বছর পর বদলাচ্ছে বিমান চলাচল বিধিমালা, বিনিয়োগ ও যাত্রীসেবায় গুরুত্ব

আগামী এক মাসের মধ্যে এ নির্দেশনার দৃশ্যমান অগ্রগতি উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পুলিশ বাহিনীতে ‘রিওয়ার্ড অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ নীতি চালু করা হয়েছে। রেঞ্জ পুলিশ ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশকে এ নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন তিনি।

ঢালাও মামলায় নিরীহদের হয়রানি নয়

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী বিভিন্ন মামলা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছু মামলায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে একসঙ্গে আসামি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও ৫০০, ১ হাজার এমনকি ২ হাজার ব্যক্তিকেও এজাহারে আসামি করা হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ঘটনায় প্রকৃত ভুক্তভোগী পরিবারের পরিবর্তে তৃতীয় পক্ষ মামলা করেছে। এতে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি, ব্যবসায়ীকে হয়রানি কিংবা চাঁদাবাজির সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং প্রকৃত ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এ ধরনের মামলা পর্যালোচনা করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি অযথা হয়রানির শিকার নিরীহ ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ সীমান্ত নজরদারিতে থার্মাল ও নাইট ভিশন ড্রোন, বাড়বে নিরাপত্তা সক্ষমতা

সিলেট রেঞ্জ ও মহানগর পুলিশের আওতাধীন সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো পরীক্ষা করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারার বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তবে এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের দেনদরবার বা আর্থিক লেনদেন বরদাশত করা হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধী ও অপরাধের নির্দেশদাতারা যেন কোনোভাবেই আইনের আওতা থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন।

কোয়ারি বন্ধে পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের ভারসাম্য

সিলেটের বালি ও পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকার কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়েও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি জানান, পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁর নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি কাজ করছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আদালতের নির্দেশনা সমন্বয় করে কমিটির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এ-সংক্রান্ত মামলাগুলোর আইনি জটিলতা দ্রুত নিরসনে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।

সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতি রোধে মনিটরিং টিমের মাধ্যমে নজরদারি আরও জোরদারের আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

‘মব’ সংস্কৃতি সহ্য করবে না সরকার

দাবিদাওয়া আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ, ঘেরাও বা অরাজকতা সৃষ্টির প্রবণতা সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, কোনো দাবি থাকলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্মারকলিপি, সংবাদ সম্মেলনসহ প্রচলিত উপায়ে তা সরকারের কাছে তুলে ধরতে হবে।

২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে ‘মব’ সংক্রান্ত ঘটনা ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে বলে সভায় উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে সিলেট অঞ্চলকে সম্পূর্ণ মবমুক্ত রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।

শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা চাইলেন বাণিজ্যমন্ত্রী

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেটকে মাদকমুক্ত করতে পুলিশ প্রশাসনকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সাধারণ মাদকসেবীদের পেছনে অতিরিক্ত সময় না দিয়ে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত শীর্ষ ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে। এ জন্য অন্তত ৫০ জন শীর্ষ মাদক কারবারির একটি নির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুত করে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানোর আহ্বান জানান তিনি।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, পর্যাপ্ত যানবাহন সরবরাহসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে প্রতিটি পুলিশ ইউনিটকে দায়িত্বশীল ও পেশাদার ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

সভায় উপস্থিত ছিলেন যারা

মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মালেক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান এবং বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।

এ সময় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন, পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকী সাহা।

সভা শেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অপরাধ সংঘটনের আগেই তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি অপরাধীদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।