দেশে কলেরার মুখে খাওয়ার টিকার (ওসিভি) প্রথম ধাপের কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ টিকা পেয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৫২ হাজার মানুষ প্রথম ডোজ থেকে বাদ পড়েছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম টিকাদানের হার দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ৪৮ লাখ ৯৯ হাজার ৪৪০ জনকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর বিপরীতে টিকা পেয়েছেন ৪০ লাখ ৪৭ হাজার ১৮ জন। ফলে টিকাদানের বাইরে রয়েছেন ৮ লাখ ৫২ হাজার ৪২২ জন।
বাদ পড়া মানুষের বড় অংশ নারায়ণগঞ্জের। জেলাটিতে ১০ লাখ ৩২ হাজার ৯৬৩ জনকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও টিকা পেয়েছেন ৬ লাখ ৭২ হাজার ২৮৭ জন। অর্থাৎ ৩ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ প্রথম ডোজ পাননি। প্রথম ধাপে টিকা না পাওয়া মোট মানুষের প্রায় ৪২ শতাংশই নারায়ণগঞ্জের।
গত ২২ আগস্ট দেশে প্রথমবারের মতো দুই ডোজের মুখে খাওয়ার কলেরার টিকা কর্মসূচি শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এক বছর বা তার বেশি বয়সী সবাইকে এই টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়। তবে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের কর্মসূচির বাইরে রাখা হয়।
প্রথম ডোজ দেওয়ার কার্যক্রম চলে ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয় ডোজের কর্মসূচি শুরু হয়েছে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং তা চলবে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত।
কলেরার উচ্চঝুঁকিতে থাকা ১৪টি এলাকায় এই টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকার সাতটি থানা হলো লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী, কামরাঙ্গীরচর, শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও। ঢাকার বাইরে কর্মসূচির আওতায় রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগর, কিশোরগঞ্জের তাড়াইল, করিমগঞ্জ ও হোসেনপুর, মুন্সীগঞ্জ সদর এবং নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা।
টিকাদানের হারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সেখানে ৯৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ প্রথম ডোজ পেয়েছেন। কিশোরগঞ্জে এই হার ৯৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মুন্সীগঞ্জে ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদানের হার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭৭ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ প্রথম ডোজ পেয়েছেন।
কেন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি
কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি অর্জিত হারকে একেবারে খারাপ বলছেন না।
তার মতে, এবার একসঙ্গে সব বয়সী মানুষকে টিকার আওতায় আনার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তুলনামূলক কঠিন ছিল। সাধারণ টিকাদান কর্মসূচিতে মূলত শিশুদের লক্ষ্য করা হলেও এবারের কর্মসূচিতে এক বছর বা তার বেশি বয়সী সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া কর্মজীবী মানুষের কর্মঘণ্টার সঙ্গে টিকাদানের সময়সূচির অসামঞ্জস্যও টিকা থেকে বাদ পড়ার একটি কারণ বলে জানান ওই কর্মকর্তা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যায় টিকাদানের ব্যবস্থা করায় সেখানে বেশি মানুষকে আওতায় আনা সম্ভব হলেও নারায়ণগঞ্জে তা করা যায়নি।
নারায়ণগঞ্জে জনবসতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা তুলনামূলক কঠিন হয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি মানুষের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থানান্তরকেও টিকা থেকে বাদ পড়ার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা গাভি—দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের একটি প্রতিনিধি দল টিকাদানের অর্জন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তা। কর্মসূচির টিকাও গাভি বিনামূল্যে সরবরাহ করেছে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ জানান, কর্মসূচিতে তাদের নির্দিষ্ট কোনো টিকাদান লক্ষ্যমাত্রা ছিল না। তিনি বলেন, এটি একটি প্রতিরোধমূলক টিকা এবং যতটুকু অর্জন হয়েছে, সেটিই জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এক বছর বা তার বেশি বয়সী সবাইকে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখা হয়েছে। শিশুদের কেন্দ্র করে পরিচালিত টিকাদান কর্মসূচির তুলনায় এ ধরনের বড় জনগোষ্ঠীভিত্তিক কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার সাধারণত কিছুটা কম হতে পারে।
পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় কলেরার টিকা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা জানান, ২০২২-২৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইসিডিডিআর,বির যৌথ গবেষণায় দেশের ১৪৪টি এলাকা কলেরার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়। এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় টিকাদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর প্রথম ধাপে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি এলাকাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিতে ব্যবহৃত কলেরার টিকাটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রাক্যোগ্যতা অর্জন করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তা জানান, পর্যায়ক্রমে বাকি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকেও কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন অর্থায়নের ওপর নির্ভর করবে।
তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার





