জাপান সফরে তারেক রহমান, ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব কপি করুন

জাপান সফরে তারেক রহমান, ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব  কপি করুন
জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, গুরুত্ব পাবে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে টোকিওর পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। সফরে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নিয়ে চার দিনের সরকারি সফরে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এ সফরে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান।

রোববার (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে টোকিওর উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। সফরকালে জাপানের সরকারপ্রধানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছাড়াও দেশটির শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে তাঁর।

২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক

সফরসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।

গত ২০ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এসব তথ্য জানান।

আরও পড়ুনঃ হরমনপ্রীত ও দীপ্তির সেঞ্চুরিতে ভারতের বড় জয়, সিরিজ জিতল ২-০ ব্যবধানে

পররাষ্ট্র সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও বাণিজ্যে বিশেষ গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রীর সফরে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হবে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি বা ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের (ইপিএ) কার্যকর বাস্তবায়ন। পাশাপাশি জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, ব্যবসায়িক যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণও আলোচ্যসূচিতে গুরুত্ব পাবে।

প্রধানমন্ত্রী ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। এ ছাড়া জাপানি ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরবেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ মক্কা-মদিনামুখী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি সৌদির, অস্বীকার হাউথিদের

সফরসূচিতে ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন’-এর চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠকের কথাও রয়েছে।

জাইকা, জেবিআইসি ও জেট্রোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক

জাপানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন, অর্থায়ন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এ তালিকায় রয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জাপানের সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এলএনজি টার্মিনাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টয়োটা কারখানা পরিদর্শন

সফরের অংশ হিসেবে জাপানের জ্বালানি ও শিল্প খাতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

সূচি অনুযায়ী, চিবা প্রিফেকচারের ফুত্তসু শহরে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের কথা রয়েছে। পাশাপাশি নাগোয়া শহরে পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং টয়োটার কারখানা পরিদর্শন করবেন তিনি।

জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাপানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে লাগানোর সুযোগ এসব সফরে গুরুত্ব পেতে পারে।

একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রত্যাশা

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, বর্তমানে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি সমঝোতা স্মারক এই সফরে স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পৃথক চুক্তির বিষয়ে কাজ চলছে।

আরও পড়ুনঃ পাঞ্জাবে দোকানের সামনে গুলি, নিহত ২; আশঙ্কাজনক আরও ৩ জন

বাংলাদেশে জাপানি কারখানা স্থাপন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে জাপানের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পাবে।

১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত উদ্যোগের কিছু অংশ ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিআইজি-বি কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

প্রস্তাবিত বিনিয়োগের খাতভিত্তিক বিবরণ হলো—

  • পরিবহন ও নগর যোগাযোগ: ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
  • সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র: ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; এর মধ্যে মাতারবাড়ি-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগও রয়েছে।
  • উৎপাদন শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল: ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
  • জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তর: ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
  • জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো: ৯৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
  • অন্যান্য অগ্রাধিকার খাত: ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর আওতায় কৃষি, ওষুধ শিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, নীল অর্থনীতি, পর্যটন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প রয়েছে।

এই বিনিয়োগ প্রস্তাবের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত শর্ত চূড়ান্ত চুক্তি ও সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনায়

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে যৌথ প্রচেষ্টার বিষয়গুলোও সম্ভাব্য আলোচ্যসূচিতে রয়েছে।

এর আগে গত এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে একটি অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। এশিয়ার জ্বালানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বাধীন একটি উদ্যোগকে বাংলাদেশ সে সময় স্বাগত জানিয়েছিল। এবারের সফরকে ওই আলোচনার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী যারা

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।

এ ছাড়া ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খান, সরকারি কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন।

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং শিল্পায়নে জাপানের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ঢাকার মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন বড় উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে।

এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে জাপান সফর করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে দেশটি সফর করেছিলেন।

সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের জাপান সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদার, বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের বিষয়ে অগ্রগতি অর্জনের প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। সফরে সম্ভাব্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলোর চূড়ান্ত ফলাফল দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।