মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের অগ্রগতি, তবু ঘাটতি রয়ে গেছে: মার্কিন প্রতিবেদন

মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের অগ্রগতি, তবু ঘাটতি রয়ে গেছে: মার্কিন প্রতিবেদন

মানব পাচার নির্মূলে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করতে না পারলেও বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টা আগের তুলনায় বেড়েছে। নতুন আইন প্রণয়ন, তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম জোরদার এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ও সুরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে পাচারকারীদের দণ্ড নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং দেশের অভ্যন্তরে মানব পাচার প্রতিরোধে এখনও উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা রয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্ষিক মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের মূল্যায়ন সময়ের তুলনায় সরকারের সামগ্রিক উদ্যোগ বাড়লেও বাংলাদেশ মানব পাচার প্রতিরোধে ‘টিয়ার ২’ শ্রেণিতেই রয়েছে।

ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও পুনর্বাসনে ঘাটতি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের কার্যক্রম পর্যাপ্ত ছিল না। একইভাবে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগেও ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে এসব সীমাবদ্ধতা বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিদেশে চাকরি পেতে কর্মীদের নিজেদের অর্থে নিয়োগ ফি পরিশোধের প্রচলন অব্যাহত থাকায় অনেককে ঋণগ্রস্ত হতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি তাঁদের ঋণভিত্তিক জবরদস্তি ও মানব পাচারের ঝুঁকিতে ফেলছে।

বিদেশে চাকরির নামে ঋণের ফাঁদে অভিবাসীরা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যান। এ ছাড়া ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশিরা কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি জমান।

বিদেশগামীদের বড় একটি অংশ স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিক। বিদেশে চাকরি ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে তাঁদের মধ্যস্থতাকারী এবং বেসরকারি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়।

নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ফি কিংবা লাইসেন্সবিহীন সাব-এজেন্টদের বেআইনি অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে অনেক শ্রমিক ঋণের বোঝায় জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে এই ঋণকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করার ঝুঁকি তৈরি হয়।

প্রতারণামূলক চুক্তি ও বেতন বকেয়ার অভিযোগ

মার্কিন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক বিভিন্ন ধরনের শ্রম শোষণের অভিজ্ঞতার কথা জানান। এর মধ্যে রয়েছে চাকরির বিষয়ে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, চুক্তির শর্ত পরিবর্তন, নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে কাজ করানো এবং কম বেতন দেওয়া বা বেতন আটকে রাখা।

পাচারকারীরা বাংলাদেশি পুরুষদের বিদেশে কৃষি ও নির্মাণশিল্পের মতো খাতে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করে শোষণ করে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশি নারী ও কিশোরীদের ভারত, পাকিস্তান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন শোষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে যেতে আগ্রহী নারীরা, যাঁদের অনেকে উপসাগরীয় দেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কাজের সন্ধানে যান, তাঁরা মানব পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

অনলাইন চাকরির প্রলোভনে সাইবার অপরাধে বাধ্য করার অভিযোগ

মানব পাচারের নতুন ও উদ্বেগজনক ধরন হিসেবে অনলাইন প্রতারণা এবং সাইবার অপরাধে জোরপূর্বক যুক্ত করার বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ এবং অনলাইন চাকরির পোর্টাল ব্যবহার করে বাংলাদেশি নাগরিকদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নেওয়ার জন্য ভুয়া চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষিত পুরুষদের উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

বিদেশে পৌঁছানোর পর তাঁদের পরিচয়পত্র ও বেতন আটকে রাখা, চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ এবং ঋণের দায় চাপিয়ে অনলাইন জালিয়াতি বা অন্যান্য সাইবার অপরাধে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা কর্মস্থল ত্যাগ করতে বা নিজের ইচ্ছায় দেশে ফিরতে বাধার মুখে পড়তে পারেন। ফলে অনলাইন চাকরির প্রস্তাব যাচাই, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মানব পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মূল্যায়নে বাংলাদেশের উদ্যোগে অগ্রগতির কথা স্বীকার করা হলেও বিচার, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং অভ্যন্তরীণ পাচার প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের সামগ্রিক চিত্র অনুযায়ী, মানব পাচার মোকাবিলায় শুধু আইন প্রণয়ন ও তদন্ত বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে পাচারকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসন দেওয়া, নিয়োগব্যবস্থায় অনিয়ম কমানো এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা বন্ধ করাও জরুরি।

বিদেশগামী কর্মীদের নিয়োগ ব্যয় ও চুক্তির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, লাইসেন্সবিহীন মধ্যস্থতাকারীদের অনিয়ম প্রতিরোধ এবং অনলাইন চাকরির প্রস্তাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো মানব পাচারের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

দ্য নিউজ ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।