আগামী দুই মাসের মধ্যে ঢাকা ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়নে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ঢাকা ওয়াসা ভবনে সংস্থাটির সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত পর্যালোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সভায় চলমান প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, দাসেরকান্দি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় পাইপলাইন সংযোগ প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি পূর্বাচল এলাকায় পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির নির্দেশ দেন তিনি।
ওয়াসা বোর্ড বিলুপ্তির উদ্যোগ
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমান আইনে ওয়াসায় বোর্ড গঠনের বিধান রয়েছে। তবে সরকার প্রয়োজনে এসব বোর্ড গঠন বা ভেঙে দিতে পারে। মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে ওয়াসা বোর্ডের কার্যক্রম জনসেবামূলক কাজের গতি কমিয়ে দিচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতিতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দেশের সব ওয়াসা থেকে বোর্ড তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
পানির চাহিদা ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রমের ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে মীর শাহে আলম বলেন, ঢাকা মহানগরীতে প্রতিদিন পানির চাহিদা ও সরবরাহের পরিমাণ ৩১৪ কোটি লিটার করে। জনসংখ্যা ও আবাসন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ গত সাত মাসে ওয়াসার কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য নতুন উদ্যোগ কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি।
পানির সংকট তৈরি হলে এর দায় সরকারের ওপরই বর্তাবে উল্লেখ করে তিনি নগরবাসীর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর নির্দেশ
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানির ৭৪ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে এবং বাকি ২৬ শতাংশ পাওয়া যায় উপরিভাগের উৎস থেকে। ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানোসহ পানির উৎসের ভারসাম্য রক্ষায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ লক্ষ্য অর্জনে উপরিভাগের পানিনির্ভর প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নিজস্ব আয় বাড়ানো ও আধুনিকায়নে জোর
ঢাকা ওয়াসার আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেবার মান বজায় রেখেই সংস্থাটির নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। এতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব তহবিল থেকে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি মিটার রিডিং ও বিলিং ব্যবস্থায় অটোমেশন কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ২০৫০ সালের পানির চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ওয়াসার জন্য পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক জনবল কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম তৈরি করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলেন।
অবৈধ পানির সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
শহরের অবৈধ ও চোরাই পানির সংযোগ শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। এসব কর্মকাণ্ডে প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের সেবা ব্যাহত করা যাবে না বলে সিবিএ ও কর্মচারী সংগঠনগুলোর নেতাদের সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনে পানির কল খোলা না রাখা এবং পানির অপচয় রোধে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর নির্দেশ দেন তিনি।
মীর শাহে আলম বলেন, দুই মাস পর তিনি আবারও ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রম পর্যালোচনা করবেন। এর মধ্যে দৃশ্যমান ও আমূল পরিবর্তন দেখতে চান তিনি, যাতে নগরবাসীর পানি সরবরাহ নিয়ে স্বস্তি নিশ্চিত করা যায়।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহা. মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে সভায় সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রকৌশলী সমিতি, ডিপ্লোমা অ্যাসোসিয়েশন, সিবিএ নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা অংশ নেন।





