বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (এফডিএমএন) নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রোববার ঢাকার হোটেল রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনের অন্তরা হলে ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘রোহিঙ্গা সংকট: টেকসই প্রত্যাবাসন ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সমাধানের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এফএসডিএসের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবরের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ও মন্ত্রীর পদমর্যাদার অধিকারী মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। এ জন্য চীন, আসিয়ান, জাতিসংঘ, জাপানসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করে কৌশলগত আঞ্চলিক জোট ও সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি জানান, সম্প্রতি জাপান সরকারের মিয়ানমারবিষয়ক জাতীয় পুনর্মিলন সংক্রান্ত বিশেষ দূত ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাসাকাওয়ার বাংলাদেশ সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি নিজে প্রত্যাবাসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে জাপান সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। চলতি মাসের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেখানে মিয়ানমারের সরকারি কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আরাকান আর্মিরও বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এ বাস্তবতায় অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন কূটনৈতিক মাধ্যম কাজে লাগিয়ে সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। তবে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে সব ধরনের কূটনৈতিক পথ খোলা রেখে সংলাপ অব্যাহত থাকবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জনপ্রশাসন উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক বা দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে সংকটটির জটিলতা এবং মিয়ানমারের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এখন সংকট ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কৌশলগত কূটনীতিতে গুরুত্ব দিতে হবে। অস্থায়ী ত্রাণ সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে টেকসই প্রত্যাবাসন এবং বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা এবং মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিসরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন পক্ষের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ বের করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সেমিনারে রোহিঙ্গা সংকটের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। প্রথম প্রবন্ধে মিয়ানমার ও রাখাইনের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরেন অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. আলী আশরাফ। দ্বিতীয় প্রবন্ধে রাখাইনের উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রত্যাবাসনের বিষয় আলোচনা করেন অধ্যাপক শাহাব এনাম খান। তৃতীয় প্রবন্ধে আঞ্চলিক কূটনীতি এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়ে প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাফায়াত আহমদ, পিএইচডি।
প্রবন্ধগুলোর ওপর আলোচনায় বক্তারা বলেন, প্রত্যাবাসন মানে শুধু রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়া নয়। ফিরে যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, বাসস্থান, জীবিকার সুযোগ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রহণযোগ্য সম্পর্ক নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা গেলেই প্রত্যাবাসন টেকসই হবে।
সেমিনারে দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।





