কুমিল্লার স্কুলছাত্রী জান্নাতুন তাজমীন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে এসেছে ফেসবুকে পরিচয়, প্রেমের সম্পর্ক এবং কক্সবাজারে যাওয়ার নানা তথ্য।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজু চৌধুরী নামের এক যুবকের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর তার সঙ্গে দেখা করতে কক্সবাজারে যায় তাজমীন।
সেখানে একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করতেন রাজু। পরে কুমিল্লায় ফেরার পথে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় ওই কিশোরী। এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে অভিযুক্ত করেছে পুলিশ।
জেলা পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
তাজমীনের মা কেয়া খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল। সে সময় তাজমীন জানিয়েছিল, এক বান্ধবীর সঙ্গে রয়েছে। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসার জন্য তার বান্ধবীর বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন মা। তবে বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমীন কিছু জানায়নি।
মেয়ের বন্ধু-বান্ধব ও চলাফেরা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখতেন এবং তাকে নজরে রাখার চেষ্টা করতেন। এত সতর্কতার পরও মেয়েকে বাঁচাতে না পারায় ভেঙে পড়েছেন তিনি।
ফেসবুকে পরিচয়, এরপর কক্সবাজার যাত্রা
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করতেন রাজু চৌধুরী। ফেসবুকের মাধ্যমে তাজমীনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে রাজুর সঙ্গে দেখা করতে কক্সবাজারে যায় ওই কিশোরী। এর আগে ৪ আগস্ট বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায় সে। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। যাওয়ার সময় মাকে বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল তাজমীন।
বাস কাউন্টারের সিসিটিভিতে তাজমীন
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানে নামে তাজমীন।
কক্সবাজারের কক্স প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ জানান, কুমিল্লায় ফেরার জন্য মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে তাজমীন তার বন্ধু রাজুকে সঙ্গে নিয়ে কাউন্টারে বাসের টিকিট কাটতে আসে। পরদিন বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছাড়ে। রাতে বাসটি হোটেল নূরজাহানে পৌঁছায়। বাসটির গন্তব্য ঢাকা পর্যন্ত।
আবদুল্লাহ আরও জানান, ঘটনাটি আলোচনায় আসার পর সিসিটিভি ফুটেজ থেকে তাজমীনের ভিডিও সংরক্ষণ করা হয়েছে। পুলিশ চাইলে তা সরবরাহ করা হবে।
বান্ধবীর সম্পৃক্ততা পায়নি পুলিশ
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাজমীনের মা যে বান্ধবীকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, ওই বান্ধবী বয়সে তার চেয়ে বড়। তবে হত্যাকাণ্ডে ওই বান্ধবী বা অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমীন মোবাইল গেমে আসক্ত ছিল এবং তার মধ্যে অবাধ্যতার প্রবণতাও দেখা যেত।
তাজমীনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, তিনি দীর্ঘদিন তাজমীনকে পড়িয়েছেন। তার ভাষায়, তাজমীন ছিল চঞ্চল স্বভাবের। মা অসুস্থ থাকলে সে তার দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করত। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং কাজের কারণে সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে মেয়েকে খুব আদর করতেন বাবা। রাগ হলে তাজমীন হঠাৎ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেত বলেও জানান শিক্ষক।
অটোরিকশাচালক সুমনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় অভিযুক্ত একজনই—সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা বাস থেকে পদুয়ারবাজারের হোটেল নূরজাহানে নামার পর কুমিল্লা শহরের রেইসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমীন। চালক সুমন তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করেন এবং পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন বলে পুলিশের অভিযোগ।
ঘটনাটি ঘিরে কুমিল্লায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে পুলিশ।





