যশোর প্রতিনিধি: এমন একটা সময় ছিল হাত ঘড়ি ছাড়া বের হওয়া একটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। সময় জানতে অফিস, বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে প্রায় সব মানুষের হাতে শোভা পেত ঘড়ি। কিন্তু কালের বিবর্তনে অতীত হতে চলেছে এ দৃশ্যপট। সস্তা ও সহজলভ্য মোবাইল ফোনে ঘড়ি সংযুক্ত থাকায় সীমিত হয়ে এসেছে জনপ্রিয় অনুষঙ্গটির ব্যবহার। এ অবস্থায় সারাদেশের মতো যশোরেও ঘড়ি ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় চলছে মন্দাভাব। দুর্দিন চলছে ঘড়ি মেরামতকারীদের। পেশা পরিবর্তন করেছেন কেউ কেউ।
যশোরর খাজুরা এলাকার ঘড়ির মেকার জীবন আশ্চার্য জানান, ‘এক সময় তিনি ঘড়ি মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু হাতে হাতে মুঠোফোন আসার পর থেকে ঘড়ির ব্যবহার নেই। হাতে গোনা কিছু মানুষ সখের বসে এই যন্ত্রটি ব্যবহার করে। মুঠোফোনে এখন সবাই সময় দেখে। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি ঘড়ি মেরামত বন্ধ করে দিয়েছেন।’
মুঠোফোনে সংযুক্ত রয়েছে ঘড়ি, টর্চ লাইটসহ নানা ফাংশান। যার কারণে ঘড়ির ব্যবহার বিশেষ করে হাতঘড়ির ব্যবহার ক্রমশ কমে আসছে। সেই সাথে ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে টর্চ লাইটের ব্যবহার। রাত্রির অন্ধকারে টর্চ লাইটের প্রয়োজন মিটিয়ে দিচ্ছে এটি। আলাদা করে ব্যাটারি পাল্টানোর ঝামেলাও এতে নেই।
মোবাইল ফোনে সংযুক্ত ঘড়ির উপর নির্ভর করেই চলছে সবাই। কোন অনুষ্ঠান মিটিং, সেমিনারে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি ভুলে যাওয়ার এতে সম্ভাবনা নেই। রিমাইন্ডার এ্যালার্ম স্মরণ করিয়ে দেবে কখন, কোথায় কোন প্রেগ্রামের সিডিউল আছে। তবে ফ্যাশান সচেতন ও রুচিশীল ব্যক্তিত্বের কাছে এখনও কমেনি ঘড়ির কদর। ভালো পোশাকের সাথে দামি ব্যান্ডের ঘড়ির ব্যবহার তাদের কাছে আগের মতই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সর্বসাধারণের ভিতর ঘড়ি ব্যবহারের রেওয়াজ যে অনেকাংশে কমে গেছে তা নিশ্চিত। ফলে যশোরের ঘড়ির দোকানগুলো এখন আর আগের মতো জমজমাট নেই । তাই অনেকে ঘড়ি ব্যবসার সাথে দোকানে অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর পসরা সাজিয়েছেন।
যশোর শহরের এমকে রোডস্থ ঘড়ির দোকানগুলোতে এ দৃশ্য চোখে পড়ে। ঘড়ির দোকানগুলোতে মোবাইল ফোন, ফোনের চার্জার, ক্যাসিং, ব্যাটারি, হেডফোন, মোবাইল সিমকার্ড, মেমোরি কার্ড, মশা নিধনের র্যাকেটসহ নানা ধরণের ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ এসব দোকানগুলো ছিল এক সময় শুধুমাত্র ঘড়ি বিক্রয় ও মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান। অনেক ঘড়ি মেরামতকারী এখন পেশা পাল্টে হয়েছেন মোবাইল মেকানিক। আগে ঘড়ি মেরামত করতেন কিন্তু বর্তমানে মোবাইল মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করেন ন্যাশনাল ইলেক্ট্রনিক্স’র কর্মচারী আশরাফ আলী। তার ভাষ্যমতে প্রতিদিন প্রায়১০/১৫ টা মোবাইল আসে মেরামতের জন্য। এতেই তার সংসার চালাতে হয়। অপরদিকে তার কাছে মাসে ৪/৫টা ঘড়ি মেরামতের জন্য কাজ আসে । তার মতে ৪/৫টা ঘড়ি মেরামতের কাজ দিয়ে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে সংসার চালানো সম্ভব না।
জেনেভা ওয়াচের মালিক শেখ আব্দুল হাকিম বলেন, আগের মত ঘড়ি তেমন আর বিক্রি হয় না। বাজার খুবই মন্দা। ১৯৭৭ সাল থেকে তাদের এ প্রতিষ্ঠান। আদি ব্যবসা তাই ছাড়তে পারছেন না। ৫০/৬০ টাকায়ও ঘড়ি পাওয়া যায় তবু ক্রেতা নেই। তবে অভিজাত ঘড়ির দোকানগুলোর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। শহরের অভিজাত ঘড়ির দোকান টাইম জোনের ব্যবস্থাপক বিষ্ণুপদ কুন্ডু বলেন, তাদের মোটামুটি বিক্রী ভাল। গ্রাহকদের অনেক সাড়া পাচ্ছেন তারা। উপহার হিসেবে ঘড়ি কিনতে অনেক অভিজাত ক্রেতারা আসেন টাইমজোনে। বিশেষ করে তাদের কর্পোরেট সেল অনেক বেশি।
এমকেরোডের সিটিজেন ওয়াচ’র ম্যানেজার রহমত আলী জানান, দিনে গড়ে ৮/১০টি ঘড়ি বিক্রি হয়। এর আগে প্রতিদিন কয়েকগুণ ঘড়ি বিক্রি করতেন। একই রোডের টাইম ওয়ার্ল্ড এর সত্ত্বাধিকারী সুমন আহম্মেদ জানান, ছেলেদের হাতঘড়ি এখনও কিছু কিছু বিক্রি হলেও মেয়েদের হাত ঘড়ি বিক্রি হয় না বললেই চলে। তবে ঘরের শোভাবর্ধনকারীরা এখনও দেয়াল ঘড়ি কিনছে। তবে ঘড়ির ব্যবসা ভাল যাচ্ছে না বলে তিনি জানিয়েছেন।