মশা দমনে ওলবাকিয়া পদ্ধতি, মশা দমনে মশারই ব্যবহার। মশার উৎপাত কমাতে এবার মশাকেই ব্যবহার করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। তবে এসব মশা সাধারণ নয়। বিশেষভাবে প্রস্তুত করা পুরুষ এশিয়ান টাইগার মশা ছেড়ে দিয়ে মশার বংশবিস্তার বন্ধ করার একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে ওয়াশিংটনের একটি আবাসিক এলাকায়।
এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা টড মন্টগোমারি। তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এমন পুরুষ মশা সরবরাহ করা হচ্ছে, যেগুলোর শরীরে রয়েছে ‘ওলবাকিয়া’ নামের প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া। পুরুষ মশা মানুষকে কামড়ায় না, ফলে এগুলো সরাসরি মানুষের জন্য মশার উৎপাত বাড়ায় না।
ওলবাকিয়া বহনকারী পুরুষ মশা যখন এমন স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, যাদের শরীরে সংশ্লিষ্ট ব্যাকটেরিয়া নেই বা ভিন্ন ধরনের ওলবাকিয়া রয়েছে, তখন তাদের উৎপাদিত ডিম স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারে না। ফলে নতুন মশার জন্ম বাধাগ্রস্ত হয়।
এই প্রক্রিয়া নিয়মিত চালিয়ে গেলে নির্দিষ্ট এলাকায় ধীরে ধীরে মশার সংখ্যা কমে আসতে পারে। রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে এ ধরনের জৈবিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির প্রতি বিভিন্ন দেশে আগ্রহ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আবাসিক এলাকায় এ ধরনের কর্মসূচি এবারই প্রথম বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ পুরো এলাকায় প্রায় ছয় লাখ পুরুষ এশিয়ান টাইগার মশা ছাড়া হবে।
মন্টগোমারির মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার সময়কাল বাড়ছে। এর ফলে রোগবাহী মশার বিস্তার এবং সক্রিয় থাকার সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। পরিস্থিতিকে তিনি মশাবাহিত রোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুতর ভবিষ্যৎ ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
তার প্রতিষ্ঠান এই প্রযুক্তিকে ‘জ্যাপ মেলস’ নামে বাজারজাত করছে। তবে পদ্ধতিটি সব ধরনের মশার ক্ষেত্রে কার্যকর নয়; নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার ওপরই এটি প্রয়োগ করা যায়।
এশিয়ান টাইগার মশা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় প্রজাতি নয়। তবে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের জীবাণু ছড়ানোর সক্ষমতার কারণে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। উত্তর ভার্জিনিয়ায় স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রথম ঘটনা শনাক্ত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কেন্টাকির বাসিন্দা মন্টগোমারি আগে প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করেছেন। ২০২৩ সালে মশা নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প খুঁজতে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে তিনি কীটতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন।
দেশীয় উদ্ভিদ ও পরাগায়নকারী প্রাণীর প্রতি আগ্রহ থেকেই মশা নিয়ন্ত্রণে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি নিয়ে কাজ করার চিন্তা আসে বলে জানান তিনি। বাড়ির আশপাশে নিয়মিত কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে তুলনামূলক নিরাপদ পদ্ধতি খুঁজতেই এই উদ্যোগ শুরু করেন।
রাসায়নিক কীটনাশকের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে চান এমন পরিবার ও পোষা প্রাণীর মালিকদের মধ্যেও পদ্ধতিটি আগ্রহ তৈরি করেছে।
এই কর্মসূচির একজন গ্রাহক স্যান্ড্রা মারকুয়ার্ট জানান, আগে মশার কারণে বাড়ির বাগানে বসা কিংবা কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কীটনাশক ব্যবহার ছাড়াই সমস্যার সমাধান পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। এখন স্বামীর সঙ্গে বাড়ির বারান্দায় খাবার খাওয়া এবং বাগানে সময় কাটানো তার জন্য অনেক সহজ হয়েছে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে ২৫ জন গ্রাহক এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছেন। প্রত্যেক গ্রাহককে ১৬ সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দেড় হাজার করে পুরুষ মশা দেওয়া হচ্ছে।
মশার শরীরে প্রাকৃতিকভাবে থাকতে পারে ওলবাকিয়া নামের ব্যাকটেরিয়া। নির্দিষ্ট ধরনের ওলবাকিয়া বহনকারী পুরুষ মশা এমন স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হলে, যাদের শরীরে সংশ্লিষ্ট ব্যাকটেরিয়া নেই বা ভিন্ন ধরনের ওলবাকিয়া রয়েছে, তাদের ডিমের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে মশার প্রজনন চক্রে বাধা সৃষ্টি হয়।
মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সিঙ্গাপুরে ২০১৬ সালে ‘প্রজেক্ট ওলবাকিয়া’ নামে বড় পরিসরে কর্মসূচি শুরু হয়। সেখানে বিপুলসংখ্যক পুরুষ মশা নিয়মিত ছাড়ার মাধ্যমে মশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ওলবাকিয়া-ভিত্তিক পদ্ধতিতে এডিস ইজিপ্টাই মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। গবেষণাটিতে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিও ৭০ শতাংশের বেশি কমার তথ্য উঠে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়াতেও একই ধরনের কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গত মে মাসে সেখানে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মশা ছাড়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে ওলবাকিয়া-ভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর ও নিরাপদ হবে, তা নিয়ে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে। তবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনা থাকায় প্রযুক্তিটি বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।