ভাস্কর্য অপসারণ বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক পরাজয় -আবদুল গাফফার চৌধুরী

বিশেষ প্রতিবেদকঃ অমর একুশের গানের রচয়িতা, প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবদুল গাফফার চৌধুরী সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ভাস্কর্য অপসারণকে বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক পরাজয় বলে অভিহিত করে বলেছেন, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে আন্দোলনে আমরা বিজয়ী হয়েছি।

আজ শুক্রবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম মিলনায়তনে তাঁর সম্মানে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এক সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, শহীদ মিনারকে এক সময় দুর্গামূর্তি বলা হয়েছিল। জামায়াত বলেছিল এখানে মসজিদ বানানো হবে। সাত বার ভাঙ্গা হয় শহীদ মিনার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শহীদ মিনার বাঙালির আশা আকাংখার প্রতীক হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দুঃখ পাই যখন শুনি কিছু বুদ্ধিজীবী ভাস্কর্য সরানোর অজুহাত হিসেবে বলেছেন, এটাতে নান্দনিক ত্রুটি আছে।

আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, আজ অত্যন্ত শংকার সঙ্গে লক্ষ্য করছি, পাঠ্যবইয়ে রবীন্দ্রনাথ, থাকছেন না, বেগম রোকেয়া, জীবনানন্দ বাদ হয়ে যাচ্ছেন। হেফাজতিরা একেবারে মূল জায়গায় হাত দিয়েছে। তবে কি ঈশ্বরচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধু, নজরুল, জীবনানন্দের বাংলাদেশ থাকবে না ? তেতুল পীর সাহেবের বাংলাদেশ হয়ে যাবে ? তিনি বলেন, হিন্দুরা দেশত্যাগ করছে, প্রগতিশীল, আলোকিত মুসলমানরাও তো থাকতে পারবে না। আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রশ্ন করেন, আওয়ামী লীগ কি আবার আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাবে ? আপস করে তো এগুনো যাবে না। শুনেছি পুলিশ পাহাড়ায় পূজা করতে হয়। এই অবস্থা তো আমরা চাইনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমি বলেছি, এটা কবরের শান্তি। উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে সুশাসন, আইনের শাসন।

আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, কেউ কেউ বলেছিলেন, এটা সাম্প্রদায়িক সংগঠন। কারণ এই সংগঠনে মুসলমান নেই। আমি পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, সমঅধিকারের জন্য এই সংগঠন কাজ করে, এই সংগঠন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। ওই সময়ে ঐক্য পরিষদের জন্ম হয়েছে যথার্থভাবেই। এই সংগঠনের প্রয়োজন আজ আরও বেশি। তিনি বলেন, মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল, যখন শুনলাম নিরীহ স্কুলশিক্ষক শ্যামল ভক্তকে নেহাৎ প্রতিহিংসার বসে জেলে পোরা হয়েছে। এতে ভয়ভীতি আরও বাড়বে। সংখ্যালঘুদের মধ্যে আরও আতঙ্ক ছড়াবে। এই পরিস্থিতি মুক্তিযুদ্ধের শক্তির পক্ষে যায় না। বোধোদয় হতে হবে, নইলে দেশ বাঁচবে না।

রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, পরপর দুটি ঘটনায় হতাশ হয়ে পড়েছি। হেফাজত ও অন্যান্য সাম্প্রদায়িক শক্তির দাবির কাছে মাথা নত করে সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ভাস্কর্য সরানো হয়েছে। এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি বড় ধরনের আঘাত। অন্যদিকে স্কুলশিক্ষক শ্যামল ভক্তকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সব ঘটনা আমরা জানি। এই দুটি ঘটনা কি সরকারের পক্ষে গেছে ? আজ সৌদি জোটে গেছে বাংলাদেশ। এই জোটের বড় মুরুব্বি আমেরিকা। দুটি দেশই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও বিরোধিতা করেছে। অথচ বাংলাদেশ মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিকারী এই জোটে শরিক হয়েছে। সেনা পাঠালে কাজ করতে হবে পাকিস্তানের সাবেক সেনাপতি রাহিল শরীফের অধীনে। এই পাকিস্তান ১৯৭১ সালে আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল।

ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি হিউবার্ট গোমেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ঐক্য পরিষদের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য, রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক, সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. রানা দাশগুপ্ত ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব পীযূষ ভট্টাচার্য। সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক বাসুদেব ধর।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।