১৯৪১ সালে অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত সাহিত্যিক স্টিফান জুইগ (Stefan Zweig) যখন ব্রাজিলে পা রাখেন, তখন দেশটির প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং বিপুল সম্পদ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই মুগ্ধতা থেকেই তিনি লিখেছিলেন তার বিখ্যাত বই ‘ব্রাজিল: ভবিষ্যতের দেশ’ (Brazil: Land of the Future)। এরপর থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্রাজিলকে ‘ভবিষ্যতের দেশ’ বা ‘অপার সম্ভাবনার দেশ’ (País do Futuro) হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি রসাত্মক এবং কিছুটা আক্ষেপের প্রবাদও প্রচলিত আছে:
“ব্রাজিল হলো ভবিষ্যতের দেশ, এবং এটি চিরকাল ভবিষ্যতের দেশই থেকে যাবে!”
ব্রাজিল প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদপুষ্ট দেশ। দেশটির মাটির ওপরে যেমন রয়েছে অফুরন্ত সম্পদ, তেমনি মাটির নিচেও রয়েছে মূল্যবান খনিজের ভাণ্ডার।
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রান্তীয় অরণ্য আমাজনের সিংহভাগই ব্রাজিলে অবস্থিত। এই বন পৃথিবীর ফুসফুস এবং বৈশ্বিক জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষার মূল চাবিকাঠি।
পৃথিবীর ছয়টি অতিকায় মহাদেশীয় আকৃতির রাষ্ট্রের মধ্যে ব্রাজিলের তাপমাত্রাই সবচেয়ে আরামদায়ক। ব্রাজিলের আবহাওয়া অতিরিক্ত ঠাণ্ডা নয়, আবার তীব্র গরমও নয়।
ব্রাজিলে ইউরোপের পর্তুগিজ, ইতালীয়, জার্মান ও স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া, জাপানের বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাপানি জনগোষ্ঠী বাস করে ব্রাজিলের সাঁও পাওলো ও পারানা রাজ্যে।
ব্রাজিলে রয়েছে বিপুল পরিমাণ লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, বক্সাইট ও নিকেলের আকরিক। এছাড়া, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্র উপকূলে বিশাল তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মিলেছে।
আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খনিজ নিওবিয়াম (Niobium)-এর প্রায় ৯৫ শতাংশই রয়েছে ব্রাজিলে। এছাড়া লিথিয়াম ও গ্রাফাইটেরও বড় মজুদ আছে এখানে।
চাষযোগ্য উর্বর জমির বিস্তৃতির দিক থেকে পৃথিবীর সমস্ত দেশকে ছাড়িয়ে যাওয়া ব্রাজিল যেন প্রকৃতির এক জাদুকরী উপহার। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান খাদ্যভাণ্ডার।
সয়াবিন, কফি, চিনি, গরুর মাংস ও মুরগির মাংস উৎপাদনে ব্রাজিল বিশ্ববাজারে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। অনুকূল জলবায়ুর কারণে অনেক অঞ্চলে বছরে তিনবার পর্যন্ত ফসল উৎপাদন করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রাজিলকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে যখন বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির খোঁজ চলছে, তখন ব্রাজিল এই দৌড়ে অনেক এগিয়ে। বিশ্বের খুব কম দেশই তাদের বিদ্যুতের সিংহভাগ গ্রিন এনার্জি থেকে পায়। ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এই হার ৯০ শতাংশের বেশি (জলবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি ও সৌরশক্তি)।
পরিবেশবান্ধব সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের জন্য ব্রাজিলকে একটি প্রধান হাবে পরিণত করার কাজ চলছে, যা ভারী শিল্পের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল স্টার্টআপ এবং ফিনটেক (Fintech) ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে ব্রাজিলে। এখানকার তরুণ ও দক্ষ জনশক্তি নতুন নতুন উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখছে।
বড় ধরনের কোনো সীমান্ত সংঘাত বা যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে ব্রাজিল মুক্ত। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কারণে বিশ্বজুড়ে তারা একটি নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে পরিচিত।
এত বিপুল সম্পদ এবং সম্ভাবনা থাকার পরও ব্রাজিল কেন এখনো মহাশক্তি হতে পারেনি? এর পেছনে রয়েছে কিছু অভ্যন্তরীণ সংকট, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। ঘন ঘন রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নীতিমালার ধারাবাহিকতার অভাব দেশটির বড় সমস্যা। দুর্নীতি এবং চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য সাধারণ মানুষের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে শুরু হওয়া “যা পারো লুটে নাও” মানসিকতা আজও ব্রাজিলের অভিজাত শ্রেণির মধ্যে বহাল আছে। অল্প কিছু ধনীর হাতে দেশের অর্ধেক জমি, আর গরিবদের ঘাড়ে অধিক করের বোঝা — সব মিলিয়ে সম্পদ থাকলেও সেই সম্পদ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। দেশটিতে সম্পদের প্রাচুর্য আছে, কিন্তু সেটিকে কাজে লাগানোর কৌশল ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।
ব্রাজিলের দক্ষিণ অঞ্চলের সান্তা কাতারিনা ও রিউ গ্রান্দে দু সুল রাজ্য বেশ নিরাপদ ও শান্ত। অন্যদিকে, দেশটির উত্তর ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চল, যেমন: সালভাদর বা ফর্তালেজা শহর এবং রিও ডি জেনিরো ও সাঁও পাওলোর মতো বড় শহরের বস্তি এলাকাগুলো (যা ‘ফাভেলা’ নামে পরিচিত) চুরি-ছিনতাইয়ের কারণে অপেক্ষাকৃত কম নিরাপদ।
প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, সবুজ জ্বালানি এবং আধুনিক প্রযুক্তির খনিজের এক বিরল সংমিশ্রণ রয়েছে ব্রাজিলের হাতে। এখন প্রশ্ন একটাই— দেশটি কী তার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারবে?
যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে ব্রাজিল শুধু লাতিন আমেরিকার নেতা নয়, বরং গোটা বিশ্বের অন্যতম প্রধান, সমৃদ্ধ ও বসবাসযোগ্য মহাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। তাই ব্রাজিলকে বলা চলে— ‘ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকা এক সম্ভাব্য মহাশক্তি’।



