গ্রীক ও রোমান আমলে ভারতের প্রসিদ্ধ নৌবাণিজ্য কেন্দ্র ছিল গঙ্গাঋদ্ধি

অভিজিৎ পান্ডে, দি নিউজ ডেস্কঃ হাজার হাজার বছর পূর্বেই প্রাচীন ভারতে গ্রিক ও রোমানদের আগমন হয়েছিল হিন্দুকুশ পর্বত ও সিন্ধু নদের তীর ঘেঁষে। তাঁদের জন্যই  ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষরা বিদেশে হিন্দু নামে পরিচিতি লাভ করেছে। গ্রীক ও রোমান সভ্যতায় ভারতের প্রসিদ্ধ নৌবাণিজ্য কেন্দ্র ছিল গঙ্গাঋদ্ধি।

গ্রিক ও রোমান ঐতিহাসিকগণ কথায় গঙ্গাঋদ্ধি নিঃসন্দেহে তদানীন্তন বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিল। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস ভারত এসেছিলেন। পাটালিপুত্রের চন্দ্রগুপ্তের মৌর্য দরবারের চমৎকার বিবরন দিয়েছেন তিনি ৩০২ খ্রীষ্টপূঃ।

প্রাচীন ভারত সম্পর্কে গ্রিক ভাষায় প্রণীত ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থে মেগাস্থিনিস উল্লেখ করেন, ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গঙ্গার সম্পদ বা গঙ্গারাষ্ট্র হিসেবে গঙ্গাঋদ্ধি বা গঙ্গাহৃদয় নামে বঙ্গরাজ্য পরিচিতি লাভ করে। তখন গঙ্গাঋদ্ধির অন্তর্ভূক্ত ছিল বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। রাজধানী ছিল বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালিপাড়ায়।

গঙ্গারিডাইদের প্রধান নৌবাণিজ্য কেন্দ্র ছিল গঙ্গানগর। ‘প্যারিপ্লাস অব দ্যা (ইরিত্রিয়ান) সি’ নামক গ্রন্থে (রচনা কাল ৪৪ সাল) বাঙালির বাণিজ্যক প্রতিষ্ঠার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এভাবে- ‘অত:পর পথ পুনরায় বাঁকনেয় এবং ডানে মুক্ত সমূদ্র এবং বায়ে দূরে উপকুল রেখে জাহাজ চালালে পরে গঙ্গা দেখা যায়, এবং তার কাছেই পূর্ব দিকে সর্বশেষ সূবর্ণ ভূমির নিকটে নদী আছে নাম গঙ্গা এবং এই নদীর উপত্তি এবং বিলয় ঠিক নীল নদের মতো। এই নদীর তীরে এক হাট পত্তন আছে। তার নাম ও নদীর নাম একই গঙ্গা।

এইখান দিয়ে আসে তেজপাতা, গাঙ্গেয় সুগন্দি তৈল ও মুক্তা এবং সর্বাধিক উৎকৃষ্ট প্রকারের মসলিস যাকে বলা হয় গাঙ্গেয়। শোনা যায় যে, এই সব স্থানের নিকটে সোনার খনি আছে এবং এক রকম সোনার মোহর চলে যাকে বলে কলতিস। বাংলার প্রাচীন সভ্যতা ও পুরাকীর্তি, শিখা প্রকাশনি, ১ম প্রকাশ ২০০০, ঢাকা, পৃঃ ২৫ “পিরিপ্লাস্ ইরিথ্রি মেরি” নামক [খৃষ্টাব্দের প্রথম শতাব্দে রচিত] গ্রন্থে নিম্ন গাঙ্গেয় ভূমিতে ‘ক্যালটিস’ নামক এক প্রকার স্বর্ণ মুদ্রা প্রচলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউরোপীয়দের মধ্যে মেগাস্থেনীসই সর্বপ্রথম গঙ্গা নদী দর্শন ও এর বিবরণ লেখেন। তবে এই ক্ষেত্রে কিছু অতিকথনও রয়েছে তার বর্ণনায়। যেমন গঙ্গার বিস্তার যেখানে সবচেয়ে কম সেখানে নাকি ৬৬ স্টাডিয়ম বা ৮ মাইল বা গড়ে ১০০ স্টাডিয়ম ইত্যাদি। তবে খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে টলেমির বর্ণনা পড়লে মনে হয় তিনি গঙ্গার মোহনার সঙ্গে সঠিকভাবে পরিচিত ছিলেন।

তার মতে গংগ খ্যাতিসম্পন্ন এক আন্তর্জাতিক বন্দর। এখানকার তৈরি সূক্ষ্ম মসলিনপ্রবাল রত্ন গুলো পশ্চিম দেশে রপ্তানি হয়। টলেমির রচনা থেকে জানা যায় তখন সমুদ্রপথে মালয়ের সঙ্গে চিকাকোল ও গঞ্জাম সন্নিহিত পলুরার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। এদিকে নরসিংদী জেলার বহুল আলোচিত উয়ারি-বটেশ্বর এলাকার ব্রহ্মপুত্র বিধৌত অঞ্চলে সুপ্রাচীনকালে যে বাণিজ্যনির্ভর একটি মহানগর গড়ে উঠেছিল তার পক্ষে প্রমাণের এখন আর অভাব নেই।

এখান থেকে উত্খননের মাধ্যমে খ্রিস্টপূর্বকালের নগরীর নিদর্শনাদি আবিষ্কৃত হয়েছে। ইটে তৈরি দালানকোঠার ধ্বংসাবশেষ যেমন পাওয়া গেছে, তেমনি আবিষ্কৃত হয়েছে অসংখ্য প্রত্নবস্তুও। এসবের মধ্যে বহির্বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগের প্রমাণবাহী প্রত্নবস্তুর সংখ্যাও নগণ্য নয়।

প্রাচীন গ্রিক বিবরণীতে পেন্টাপলিস অর্থাৎ পঞ্চনগরীর উল্লেখ থাকায় বোঝা যায়, প্রায় দু’হাজার বছর আগেও গ্রিকরা পঞ্চনগরীর কথা জানত। নিঃসন্দেহে বাণিজ্যিক গুরুত্ব এই নগরীর ছিল। কেউ কেউ দিনাজপুরের চরকাই বিরামপুরে, আবার কেউ কেউ জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবির পাথরঘাটায় এই নগরীর অবস্থান থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। পঞ্চনগরী নামটা শুনে প্রতীতী জন্মে যে, পাঁচটি পরস্পর সংলগ্ন নগরীর একত্রীভূত নাম—পঞ্চনগরী।

আড়াই হাজার বছর পূর্বে অথবা বুদ্ধদেবের আগে বাংলা দেশে উন্নত বড় বড় নৌকা তৈরি হত। বিজয় যে জাহাজে লঙ্কা যান, সে জাহাজের একটা ছবি অজন্ত-গুহার মধ্যে পাওয়াগেছে। ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা মনে করেন, বুদ্ধের সময়ও তাম্রলিপ্তি একটি বড় বন্দর ছিল। অর্থশাস্ত্রে বলে যে, যিনি রাজার ‘নাবধ্যক্ষ’ থাকতেন, তিনি ‘সমুদ্র সংযানেরও অধ্যক্ষতা করতেন। সুতরাং তখনও যে বঙ্গ মগধ হতে সমূদ্রে জাহাজ যেত, সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই বঙ্গ মগধ।

‘রামেষু নাম্নেী যবন্যস্ত’ – এর মানে, ‘সমুদ্র সংযানে’রও অধ্যক্ষ ‘নাবধ্যক্ষ’ রামোয়ু নামে এক যবনের পোত তার নৌকায় চড়ে দূর সমুদ্রে যাওয়ার সময় অন্য এক পোতকে ডুবিয়ে দেয়। এই কথার ভিত্তিতে অনেকে মনেকরেন, ভারত উপমহাদেশে বাঙালীরাই প্রথম সমুদ্রভ্রমণকারী শক্তিশালী জাতি। এর প্রমাণ হিসেবে পান্ডু রাজার ঢিবিতে পাওয়া স্টিটাইট (Steatite) পাথরের কতকগুলি চিহ্ন খোদিত একটি গোলাকার সীলকে হাজির করেন।

মনে করা হয় যে সীলটির খোদিত চিহ্নসমূহ চিত্রাক্ষর(Pictpgraph) এবং সীলটি ভূমধ্যসাগরীয় ক্রিট দ্বীপের, প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বে নির্মিত। এই সীল ও প্রাপ্ত অন্যান্য নিদর্শন থেকে মনে করা হয় প্রাচীন সভ্যতার ক্রীট দ্বীপের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো। কর্মচঞ্চল তাম্রলিপ্ত বন্দর দিয়ে নিয়মিত এই সমস্ত বহির্বাণিজ্য হত।

তেজপাতার ব্যবসাও হত তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে। পুণ্ড্রে প্রচুর তেজপাতা উৎপন্ন হত, সেগুলো করতোয়া ও গঙ্গাদ্বারা বাহিত হয়ে তাম্রলিপ্তে এসে পৌঁছত। এদিকে পিপ্পলী (এক রকমের দীর্ঘ গোলমরিচ) এক পাউণ্ড বা আধ সের বিক্রি হত পনেরো স্বর্ণমুদ্রা দামে, প্লিনির ইন্ডিকা নামক গ্রন্থে জানা যায়। সমুদ্র বাণিজ্যে বাঙালির প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ কখন শেষ হয়েছিল তার সঠিক তারিখ নির্ণয় করা কঠিন।

ট্যাগ PictpgraphSteatiteঅজন্ত গুহাঅভিজিৎ পান্ডেঅর্থশাস্ত্রআড়াই হাজার বছর পূর্বেআন্তর্জাতিক বন্দরআবিষ্কৃতইউরোপীয়ইরিত্রিয়ানউয়ারি বটেশ্বরকরতোয়াকর্মচঞ্চল তাম্রলিপ্তকর্মচঞ্চল তাম্রলিপ্ত বন্দরকলতিসকোটালিপাড়াক্যালটিসক্রিট দ্বীপখৃষ্টাব্দের প্রথম শতাব্দখ্রিস্টপূর্বখ্রীষ্টীয়গঙ্গা নদী দর্শনগঙ্গাদ্বারাগঙ্গার মোহনাগঞ্জাম সন্নিহিত পলুরাগাঙ্গেয়গাঙ্গেয় সুগন্দি তৈলগোপালগঞ্জ জেলাগোলাকার সীলগ্রিক পর্যটকগ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিসগ্রিক বিবরণীচরকাই বিরামপুরেচিকাকোলচিত্রাক্ষরটলেমিতাম্রলিপ্তিতেজপাতাদালানকোঠাদি নিউজ ডেস্কদীর্ঘ গোলমরিচদ্য ক্যামব্রিজ ইকোনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়াধ্বংসাবশেষনাবধ্যক্ষনিম্ন গাঙ্গেয় ভূমিনীল নদপঞ্চনগরীপাঁচবিবির পাথরঘাটাপান্ডু রাজাপান্ডু রাজার ঢিবিপিপ্পলীপিরিপ্লাস্ ইরিথ্রি মেরিপুণ্ড্রপুরাকীর্তিপেন্টাপলিসপ্যারিপ্লাস অব দ্যা সিপ্রত্নবস্তুপ্রথম সমুদ্রভ্রমণকারীপ্রবাল রত্নপ্রাচীনপ্রাচীন গ্রিকপ্রাচীন গ্রিক বিবরণীপ্রাচীন সভ্যতাপ্লিনির ইন্ডিকাবঙ্গ মগধবহির্বাণিজ্যবাঙালীবাণিজ্যনির্ভরবিজয়বুদ্ধদেবব্রহ্মপুত্রভারত উপমহাদেশেমসলিনমসলিসমহানগরমালয়মুক্তামেগাস্থিনিসমেগাস্থেনীসইরামেষু নাম্নেী যবন্যস্তলঙ্কাশক্তিশালী জাতিসমুদ্র সংযানেরসুপ্রাচীনকালসূক্ষ্মসূবর্ণ ভূমিসোনার খনিসোনার মোহরস্টিটাইটস্বর্ণ মুদ্রাস্বর্ণমুদ্রা

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Ovi Pandey
লেখক / প্রতিবেদক

Ovi Pandey

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।