আমেরিকা সচরাচর বলে থাকে যে, ভারত তাদের রণকৌশলের সহযোগী। অথচ দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে কোনো স্থায়ী রাষ্ট্রদূত নেই ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে। জো বাইডেনের প্রশাসন এই দু‘বছরে ছয়জন কূটনীতিককে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব দিয়েছে – ভারতের দূতাবাস সামলানোর জন্য। কিন্তু পূর্ণ সময়ের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেনি। ফরেন পলিসি ডট কম জানাচ্ছে : এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের যত দূতাবাস বা উপ-দূতাবাস আছে, চীনের দূতাবাসের মোট সংখ্যা তার থেকেও বেশি।
অবশ্য ভারতে রাষ্ট্রদূত পাঠানোর কোনো উদ্যোগই যে বাইডেন প্রশাসন নেয়নি, তা নয়। তারা লস অ্যাঞ্জেলসের প্রাক্তন মেয়র এরিক গার্সেটিকে বেছেছিল – দিল্লিতে নতুন রাষ্ট্রদূত হিসাবে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, গার্সেটি তার এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগের যথাযথ ব্যবস্থা নেননি। তারপরেই সেনেটে এরিক গার্সেটির মনোনয়ন নিয়ে ভোটাভুটির প্রক্রিয়া থমকে যায়।
হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকা গার্সেটির সম্বন্ধে লিখেছে, “তিনি বেশ কয়েকবার ভারতে এসেছেন এবং তিনি হিন্দি ও উর্দু পড়েছেন।”
হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকার ওই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ দফতরের এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, “যখন প্রায় দু‘বছর ধরে চেষ্টা করেও একজনের মনোনয়ন পাশ করাতে পারছ না, এমন একটা সেনেট থেকে, যেটা আবার তোমার দলেরই নিয়ন্ত্রণে, তখন বোধহয় বলে দেয়াই ভাল যে ওই মনোনয়নটা আর করা যাবে না।”
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের যে রেষারেষির সম্পর্ক, আবার চীন-ভারত সীমান্তে যে উত্তেজনা সবসময়েই বজায় থাকে, সেই প্রেক্ষাপটে দিল্লিকে কাছে পেতে চাইবে ওয়াশিংটন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের রাজধানীতে দু‘বছর ধরে কোনো পূর্ণ সময়ের দূত কেন পাঠাচ্ছে না বাইডেন প্রশাসন, সেই প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকরাও মনে করেন যে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় শক্তি-বিন্যাসের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একথা সত্য যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় নরেন্দ্র মোদী প্রশাসনের সঙ্গে আমেরিকার যতটা দহরম-মহরম সম্পর্ক ছিল, জো বাইডেন সরকারের আমলে সেটা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণারত অম্বুজ সাহু ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লিখেছেন, “দিল্লিতে কোনো রাষ্ট্রদূত না থাকার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বা ভারতে আসলে কী ঘটছে, তার দিকে নজর রাখা সম্ভব হচ্ছে না।”
সাহু আরও লিখেছেন, “ভারত সম্পর্কিত তথ্যের জন্য বাইডেন প্রশাসনকে পেশাদার কূটনীতিকদের যোগাড় করা তথ্যের বদলে এখন শুধুই নির্ভর করতে হচ্ছে তথাকথিত বিশ্লেষক বা ‘ইন্ডিয়া ওয়াচারদের’ ওপরে।”
সাহুর ভাষায়, “এর ফলে দিল্লির সাথে যেকোনো বিষয়ের সমাধানে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নামতে হচ্ছে। যেমন সম্প্রতি ভারতীয়দের ভিসার সমস্যা মেটানোর মতো একটা সাধারণ বিষয়তেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে কথা বলতে হয় সেক্রেটারি অফ স্টেট অ্যান্থনি ব্লিংকেনের সাথে।”
নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বিশ্লেষক মীনাক্ষী আহমেদ লিখেছেন, “এটা কল্পনা করাও কঠিন যে যুক্তরাষ্ট্র গত দু‘বছর ধরে ভারতে কোনো রাষ্ট্রদূত পাঠায়নি। নিজেদের অংশীদার বলে কয়েকবারই উল্লেখ করেছেন বাইডেন। তার পরেও এই পরিস্থিতি। দু’টি দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একজন রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
মীনাক্ষী আহমেদ আরও লিখেছেন, “১৯৬২ সালে চীন যখন ভারতের ওপরে হামলা চালায়, ওই সময়ে জন কেনেথ গলব্রেথ দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। গলব্রেথ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির কাছের লোক ছিলেন, আবার জওহরলাল নেহরুর সাথেও তার সুসম্পর্ক ছিল। কেনেডি ও নেহরুর মধ্যে যে অবিশ্বাসের সম্পর্ক ছিল, সেটা গলব্রেথই ভাঙতে পেরেছিলেন। ওই যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভারতের সমর্থনে দাঁড়িয়েছিল।”



