তামাক ও সিগারেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম। তিনি বলেছেন, ধূমপান ও তামাক ব্যবহারের কারণে দেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সোমবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলনকক্ষে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন ২০২৬ বাস্তবায়নে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তথ্য অধিদফতর ও মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ।
তামাকের রাজস্বের চেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি বেশি
মো. শাহ আলম বলেন, বাংলাদেশে তামাক ও সিগারেট খাত থেকে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। অন্যদিকে ধূমপানের কারণে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুনঃ অতিরিক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনে অর্থ লোপাটের অভিযোগ: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
তিনি বলেন, তামাক ব্যবহারের ক্ষতি শুধু অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও। তাই ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার একেবারে নির্মূল করা সম্ভব না হলেও তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
নাটক, সিনেমা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধূমপানের প্রচার বা উপস্থাপনার বিষয়টি তুলে ধরে অতিরিক্ত সচিব বলেন, এসব মাধ্যমে তামাক ব্যবহারের প্রচারণা বন্ধে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট নীতিমালা শিগগিরই চূড়ান্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
তামাকের ব্যবহার কমাতে তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
দেশব্যাপী প্রচারের উদ্যোগ তথ্য কর্মকর্তাদের
সভাপতির বক্তব্যে প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে তামাক ও ধূমপানবিরোধী আন্দোলন চলে আসছে। এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
আরও পড়ুনঃ নরওয়ের রাজা পঞ্চম হারাল্ডের মৃত্যুতে বাংলাদেশের শোক
তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত তথ্য কর্মকর্তারা ধূমপানবিরোধী প্রচার কার্যক্রম আরও জোরদার করবেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে জনমত তৈরি এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পারলে তামাকবিরোধী আন্দোলন আরও সফল হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বছরে দুই লাখ মৃত্যুর দাবি
আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন মানসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. অরুপরতন চৌধুরী। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ মানুষ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে মারা যান। এ ছাড়া প্রায় ১২ লাখ মানুষ তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন এবং প্রায় এক লাখ মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুনঃ ঢাকার পরিবেশ উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরামর্শ স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর
তিনি বলেন, তামাক ব্যবহারের কারণে মুখের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের প্রকোপ বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নাটক-সিনেমায় ধূমপানের দৃশ্য নিয়েও উদ্বেগ
ড. অরুপরতন চৌধুরী অভিযোগ করেন, আইন থাকা সত্ত্বেও নাটক, চলচ্চিত্র ও ওটিটি কনটেন্টে ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এ ধরনের উপস্থাপনা তরুণদের মধ্যে ধূমপান ও মাদকের প্রতি আগ্রহ তৈরিতে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সৃজনশীলতা বা শিল্পের স্বার্থে ধূমপানের দৃশ্য দেখানোর যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। চলচ্চিত্রের ছাড়পত্র দেওয়ার সময় তামাক ও ধূমপান প্রদর্শনের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার দাবি জানান তিনি।
আইনের সংশোধনী নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন
সভায় ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন ২০২৬’ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি সংস্থা ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার আমিনুল ইসলাম সুজন।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের ম্যানেজার (তামাক নিয়ন্ত্রণ) ফাহমিদা ইসলাম, মাদকবিরোধী সংগঠন প্রত্যাশার সাধারণ সম্পাদক হেলাল আহমেদ, বিইআর-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল, টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেলের প্রকল্প সমন্বয়কারী ফারহানা জামান লিজা এবং ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের সিনিয়র প্রকল্প কর্মকর্তা সামিউল হাসান সজীব।
এ ছাড়া তথ্য অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সভায় তথ্য অধিদফতরের ৪০-এর বেশি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন তামাকবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।




