ঝিনাইদহের সোনালীপাড়ার ভাড়া মেসটি ছিল জঙ্গিদের আস্তানা

আরিফ মোল্ল্যা, ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহের সোনালীপাড়ার সাবেক সেনা সার্জেন্ট কওছার আলী ভাড়া দেওয়া মেসটি ছিল মূলত জঙ্গীদের আস্তানা। ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার সন্দেহভাজন জঙ্গী নিবরাস ইসলাম পরিচয় গোপন করে সাঈদ নামে ভাড়া করা বাড়ীর ওই মেসটিতে থাকতেন। আর মাস খানেক তার ভালাতো ভাই পরিচয়ে সেখানে থাকতেন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় নিহত আবির রহমানও। আবিরের ছবি দেখে শুক্রবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সোনালীপাড়ার বাসিন্দারা। তবে ওই ভাড়া বাড়ির মেসে থাকা বাকি ৬ জনের নাম ও পরিচয় কেউই দিতে পারেনি।

আবিরের ব্যাপারে জানতে শুক্রবার আবার ওই বাড়িতে গেলে বিলকিস নাহার ঘরের দরজা খোলেননি। ঘরের জানালাও বন্ধ ছিল। ঘরের ভেতর থেকে একজন নারী বলেন, তাঁদের ওপর নানাভাবে চাপ এসেছে। তাঁরা আর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। কারা চাপ দিচ্ছে, সেটাও বলতে চাননি তাঁরা।

তবে ঝিনাইদহ শহরে সোনালীপাড়ার ওই জঙ্গি আস্তানার লাগোয়া মসজিদের মাঠে স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে ফুটবল খেলায় অংশ নিতেন সাঈদ নামধারী নিবরাস। ওই মাঠে খেলতেন এমন কয়েকজন স্থানীয় তরুণকে শুক্রবার আবিরের ছবি দেখালে তাঁরা তাঁকে ‘সাঈদ ভাইয়ের খালাতো ভাই’ হিসেবে শনাক্ত করেন । জঙ্গিদের ভাড়া করা ওই বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন যে নারী, তিনিও আবিরের ছবি দেখে শনাক্ত করেছেন।

এর আগের দিন বৃহস্পতিবার বাড়ির মালিকের স্ত্রী ও ফুটবল খেলার সাথিরা ছবি দেখে নিবরাসকে শনাক্ত করেন।

শুক্রবার আবার সেখানে আবিরের ছবি দেখানো হয়। স্থানীয় দুজন তরুণ (তাঁদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নাম প্রকাশ করা হলো না) বলেন, এই ছবি সাঈদ ওরফে নিবরাসের খালাতো ভাইয়ের। তিনি সবার সঙ্গে মিশতেন না, ফুটবলও খেলতেন না। মাঠের পাশে বসে সময় কাটাতেন। মাঝেমধ্যে মাঠের পাশে ছোট জায়গায় বাচ্চাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন।

ওই দুই স্থানীয় তরুণ বলেন, ‘ওই ভাইয়ের নাম কী জিজ্ঞাসা করলে সে জবাব দেওয়ার আগেই সাঈদ ভাই বলতেন, এটা আমার খালাতো ভাই।’ তাঁরা বলেন, আবিরের চলাফেরা কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ ছিল। কেমন যেন হেলেদুলে হাঁটতেন।
আবিরদের মেসে তিন বেলা রান্না করে দিয়ে আসতেন স্থানীয় এক নারী। তিনি বলেন, ‘সাঈদ ভাই (নিবরাস) আর ছবির এই ভাই (আবির) একই রুমে থাকতেন। তাঁরা বেশির ভাগ সময় ঘরেই কাটাতেন।’ তিনি বলেন, সাঈদ ওরফে নিবরাস মাঝে মাঝে মোটরসাইকেল চালিয়ে বাইরে যেতেন, তবে আবিরকে বাইরে যেতে তিনি দেখেননি। আবির কবে মেস ছেড়ে গেছেন, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

গত ৬ জুলাই ভোরে সোনালীপাড়ার ওই বাড়ির মালিক সাবেক সেনা সার্জেন্ট কওছার আলী, তাদের  কলেজপড়ুয়া দুই ছেলে বিনছার আলী ও বেনজির আলী, পাশের মসজিদের ইমাম মো. রোকনুজ্জামান ও সহকারী ইমাম সাব্বির আহম্মেদ রবকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে নিয়ে গেছে বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। এখন পর্যন্ত এঁদের কোনো বাহিনী আটক করার কথা স্বীকার করেনি । স্থানীয় পুলিশ ও র‌্যাব বলছে, তারা এ ব্যাপারে কিছু জানেন না।

এদিকে জঙ্গী সাঈদ পরিচয়ে নিবরাসসহ ৮ জন ঝিনাইদহে গত ৪ মাস ধরে বসবাস করার সময়ে ৪ টি আলোচিত হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকা-ের মধ্যে গত ৭ জুন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার করোতিপাড়া গ্রামের আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলী খুন হন। এর আগে গত ৭ জানুয়ারী ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালুহাটী গ্রামের বেলেখাল বাজারে খ্রীষ্টান হোমিও চিকিৎসক সমির বিশ্বাস ওরফে সমির খাজা ও ১৪ মার্চ কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা এলাকার শিয়া মতবাদের হোমিও চিকিৎসক আব্দুর রাজ্জাককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ গত ১ জুলাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার উত্তর কাস্টসাগরা গ্রামের স্থানীয় রাধামদন মঠের গোসাই (সেবায়েত) শ্যামানন্দ দাসকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এসব ঘটনার সাথে তারা জড়িত বলে সন্দেহ করছেন ঝিনাইদহবাসী। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও অনলাইনে এসব খবর প্রকাশের পর চায়ের দোকান, হোটেল রেস্তোরাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানের মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তাহলে তারাই কি এসব হত্যাকা-ের সাথে জড়িত!

কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় নিহত আবিরের বাসা ঢাকায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ পড়তেন। এর আগে তিনি ‘ও’ লেভেল, ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন করেন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়ালে (বিআইটি)। আবিরদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলায় বলে জানাগেছে।

এ ব্যাপারে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কোন তথ্য দিতে পারেননি। ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার শেখ জানান, এসব ঘটনার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তিনি বলেন, এদের কে আটক করেছে, কেন করেছে বলতে পারছি না।

সদর সার্কেলের এএসপি গোপিনাথ কানজিলালও জানান, উক্ত ঘটনার বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই।

অপরদিকে র‌্যাব-৬ ঝিনাইদহ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মুনির জানান, তারা কাউকে আটক করেননি। এ সংক্রান্ত কোনও তথ্যও তাদের কাছে নেই। তবে বাইরের কোনও টিম এসে তাদের আটক করলেও করতে পারে।

উল্লেখ্য, ঝিনাইদহের সোনালীপাড়ায় জঙ্গিদের অস্তানার পাশের মসজিদের ইমাম ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রোকনুজ্জামান জঙ্গি সাঈদ ওরফে নিবরাসকে ২ হাজার ৩ টাকায় সাবেক সেনা সার্জেন্ট কওছার আলীর বাড়ীটি ভাড়া করে দেয়। এখন তার বিরুদ্ধে জঙ্গিদের আশ্রয়দাতা অভিযোগ উঠেছে। আজ ইমামকে আশ্রয়দাতা হিসেবে উল্লেখ করে যশোর থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকা খবর প্রকাশ করেছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।