× Banner
সর্বশেষ
শিকলবিহীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যই শিকল ভেঙেছি আমরা – তথ্যমন্ত্রী নদী দূষণ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই – প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছা পূরণ রাকিবের, তুললেন সেলফি অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাণিজ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণা সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বিজ্ঞান, ধর্ম ও সমাজের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন – স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ভিআইপি-সিআইপিসহ সবার জন্য বিমানবন্দরে সমান নিরাপত্তা তল্লাশি – বিমান মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে স্বপ্নপূরণ অনুশ্রীর, মিলল হারমোনিয়াম উপহার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন আগামী ১৬ আগস্ট – সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বাবার কবরে শ্রদ্ধা জানালেন জুবাইদা রহমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ আগামী ১০ আগস্ট

ডেস্ক

জগন্নাথের রথযাত্রা: মাসির বাড়ি নয়, মাতৃস্নেহের টানে গুন্ডিচা মন্দিরে প্রত্যাবর্তন

Kishori
হালনাগাদ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
গুন্ডিচা মন্দিরে প্রত্যাবর্তন
গুন্ডিচা মন্দিরে প্রত্যাবর্তন

হিন্দু পুরাণ ও ওড়িয়া ঐতিহ্য অনুযায়ী মালব দেশের অবন্তী অঞ্চলের ধর্মপরায়ণ রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এবং তাঁর পত্নী রানি গুন্ডিচা এক গভীর শোকের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। তাঁদের আঠারো জন পুত্রই অকালমৃত্যুবরণ করেন। সন্তানের শোকে ক্লান্ত ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া রানি গুন্ডিচা যখন প্রভু জগন্নাথ ও বলরামকে লাভ করেন, তখন তাঁদের প্রতি মাতৃসুলভ স্নেহ নিবেদন করতে শুরু করেন। তাঁর অনুভূতি ছিল—“আমার আর কোনো সন্তান নেই, তোমরাই আমার সন্তান।” গুন্ডিচা মন্দিরে প্রত্যাবর্তন

জগন্নাথের আবির্ভাব ও জনকুপিণ্ডি

জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত দেবস্নান পূর্ণিমা বা স্নানযাত্রাকে প্রভু জগন্নাথের প্রধান আবির্ভাব দিবস হিসেবে মানা হয়। ঐতিহ্য অনুসারে, গুন্ডিচা মন্দিরেই প্রথম জগন্নাথের প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হয়। মন্দিরের সেই পবিত্র বেদিকে ওড়িয়া ভাষায় “জনকুপিণ্ডি” নামে অভিহিত করা হয়। ওড়িয়া ঐতিহ্যে এই দিনটিকেই জগন্নাথের প্রধান আবির্ভাব তিথি হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্বাস করা হয়, জগন্নাথের মূর্তি প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গুন্ডিচা মন্দিরে। সেই প্রতিষ্ঠাবেদিকে ওড়িয়ায় বলা হয় ‘ଜନ୍ମବେଦୀ’ (জন্মবেদী), বাংলায় যাকে অনেকে ‘জন্মপিণ্ডি’ বলেও উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, গুন্ডিচা দেবীর গৃহেই জগন্নাথের প্রথম প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল—এমন একটি আবেগঘন ধারণা ওড়িয়া ভক্তিমূলক সাহিত্যে দেখা যায়।

এই নামের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। ভক্তদের বিশ্বাস, গুন্ডিচা মায়ের গৃহেই জগন্নাথের প্রকাশ বা আবির্ভাব ঘটে। তাই জনকুপিণ্ডি কেবল একটি বেদি নয়, এটি মাতৃস্নেহ ও ঈশ্বরীয় জন্মস্মৃতির প্রতীক।

রথযাত্রার আদি অর্থ

যখন প্রভু জগন্নাথ নতুন শ্রীমন্দিরে গমন করতে উদ্যত হন, তখন রানি গুন্ডিচা বিষণ্ন হয়ে প্রশ্ন করেন—“তুমি চলে গেলে আমার কাছে কী থাকবে?” তখন প্রভু জগন্নাথ মাতৃস্নেহের মর্যাদা দিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি প্রতি বছর নয় দিনের জন্য তাঁর কাছে ফিরে আসবেন।

এই প্রতিশ্রুতির স্মারক হিসেবেই রথযাত্রার সূচনা হয়েছে বলে বহু ওড়িয়া আচার্য ও ঐতিহ্যবিদ মনে করেন। রথযাত্রায় জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা শ্রীমন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরে গমন করেন, যা আসলে তাঁদের “জন্মপিণ্ডি” বা মাতৃগৃহে প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।

মাসির বাড়ি নয়, মায়ের বাড়ি

বাংলা অঞ্চলে প্রচলিত ধারণা হলো—জগন্নাথ রথে চড়ে “মাসির বাড়ি” যান। কিন্তু ওড়িয়া প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী, রথযাত্রার গন্তব্য গুন্ডিচা মন্দির, যা রানি গুন্ডিচার গৃহ এবং মাতৃস্নেহের প্রতীক। তাই এটিকে “মায়ের বাড়ি” বলা অধিকতর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য।

তবে “মাসি” প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত নয়। রথযাত্রার পথে একটি বিশেষ স্থানে জগন্নাথের সঙ্গে মাসির প্রতীকী সাক্ষাৎ ঘটে বলে লোকবিশ্বাস রয়েছে। অর্থাৎ মাসির সঙ্গে দেখা হয় পথিমধ্যে, কিন্তু রথযাত্রার মূল গন্তব্য কখনোই মাসির বাড়ি নয়।

‘মাসির বাড়ি’ ধারণাটি কোথা থেকে এল?

বাংলা ভাষাভাষী সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আছে যে জগন্নাথ রথে চড়ে ‘মাসির বাড়ি’ যান। তবে ওড়িয়া ঐতিহ্যের মূল ব্যাখ্যায় গন্তব্যস্থল হলো গুন্ডিচা মন্দির, যা গুন্ডিচা দেবীর সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘মাসির বাড়ি’ ধারণাটি মূলত বাংলা লোকসংস্কৃতির জনপ্রিয় রূপান্তর। পুরীতে অবশ্য একটি ‘মাসি মা’ মন্দির রয়েছে, যেখানে রথযাত্রার পথে প্রভুর বিশেষ বিরতি ও আচার পালিত হয়। অর্থাৎ, মাসি মায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐতিহ্য আছে, কিন্তু রথযাত্রার প্রধান গন্তব্য হিসেবে গুন্ডিচা মন্দিরই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

কেন জগন্নাথ গুন্ডিচা মন্দিরে যান?

লোককথায় বলা হয়, যখন জগন্নাথকে মূল মন্দিরে নিয়ে যাওয়ার সময় আসে, তখন গুন্ডিচা দেবী ব্যথিত মনে প্রশ্ন করেন—‘তুমি চলে গেলে আমার কাছে কী থাকবে?’ তখন প্রভু মায়ের স্নেহের মর্যাদা দিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি প্রতি বছর কয়েক দিনের জন্য তাঁর কাছে ফিরে আসবেন। সেই আবেগ থেকেই রথযাত্রার সময় জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা মূল মন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরে গমন করেন এবং সেখানে নয় দিন অবস্থান করেন।

এই ব্যাখ্যায় রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি এক সন্তানের প্রতি মায়ের আকুলতার প্রতীক, আর সন্তানের মায়ের কাছে ফিরে আসার বার্ষিক অঙ্গীকার।

গুন্ডিচা মন্দিরের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

গুন্ডিচা মন্দিরকে ভক্তরা কেবল একটি উপাসনালয় হিসেবে দেখেন না। এটি মাতৃত্ব, স্নেহ, বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছর রথযাত্রায় প্রভু জগন্নাথের সেখানে গমন যেন সেই চিরন্তন বার্তাই বহন করে—সন্তান যত দূরেই যাক, মায়ের ডাকে সে আবার ফিরে আসে।

রথযাত্রার আবেগময় তাৎপর্য

ওড়িয়া ভক্তি-ঐতিহ্যে তাই রথযাত্রাকে অনেকেই দেখেন—

  • জগন্নাথের জন্মস্মৃতির স্থানে প্রত্যাবর্তন হিসেবে,
  • গুন্ডিচা দেবীর মাতৃস্নেহের সম্মান হিসেবে,
  • এবং ভক্ত ও ভগবানের পারিবারিক সম্পর্কের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে।

এই কারণেই পুরীর রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং মায়া, স্মৃতি, শোক ও পুনর্মিলনের এক গভীর মানবিক কাহিনি হিসেবেও সমাদৃত।


এ ক্যটাগরির আরো খবর..