একাত্তরের চার ছাত্রনেতার শেষজন তোফায়েল আহমেদের প্রস্থান ও মুজিব বাহিনীর ইতিহাস

একাত্তরের চার ছাত্রনেতার শেষজন তোফায়েল আহমেদের প্রস্থান ও মুজিব বাহিনীর ইতিহাস

একাত্তরের ছাত্ররাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘চার ছাত্রনেতা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের শেষ জীবিত প্রতিনিধিদের অন্যতম তোফায়েল আহমেদের প্রস্থান একটি ঐতিহাসিক প্রজন্মের স্মৃতি ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের আলোচনাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ), যা পরে ‘মুজিব বাহিনী’ নামে পরিচিতি পায়, ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটি বিশেষ সংগঠন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, এই বাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর প্রচলিত কমান্ড কাঠামোর বাইরে পরিচালিত হতো। এর প্রশিক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে ভারতীয় স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের কমান্ডার সুজন সিং উবানের ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়।

তবে বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর রাজনৈতিক ভিত্তি যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তৈরি হয়নি। এর পটভূমি গড়ে ওঠে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থানের সময়। সে সময় ছাত্রলীগের কর্মীদের মুখে উচ্চারিত হতো বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী স্লোগান— ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’। পরবর্তীতে ‘জয় বাংলা’ এবং ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগান আন্দোলনের অন্যতম পরিচয়ে পরিণত হয়।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, ১৯৭১ সালের মে মাসে বিএলএফের প্রশিক্ষণ শুরু হয় এবং তা অক্টোবর পর্যন্ত চলতে থাকে। প্রায় ১০ হাজার তরুণ ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। অক্টোবর মাসে শেষ ব্যাচের প্রশিক্ষণের সময় বিএলএফের নাম পরিবর্তন করে ‘মুজিব বাহিনী’ রাখা হয়।

মুজিব বাহিনীর চরিত্র ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, এটি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত একটি সংগঠন। সে সময় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আশঙ্কা ও কৌশলগত ভাবনা বিদ্যমান ছিল। প্রবাসী সরকার ও মুজিব বাহিনীর সম্পর্ক এবং কর্তৃত্বের প্রশ্ন নিয়েও বিভিন্ন গবেষণায় আলাদা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর সম্পৃক্ততার কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়, ভারত সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সমন্বয় করা হয়েছিল। সে সময় ‘র’-এর প্রধান আর. এন. কাও এবং মাঠপর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকার কথাও আলোচনায় আসে।

কলকাতার ভবানীপুর এলাকার সানি ভিলা নামের একটি বাড়িতে বিএলএফের চার নেতার নিয়মিত বৈঠকের কথাও বিভিন্ন স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন বলে উল্লেখ রয়েছে। ফজলুল হক মনি ‘মনোজ’, সিরাজুল আলম খান ‘সরোজ’, আব্দুর রাজ্জাক ‘রাজু’ এবং তোফায়েল আহমেদ ‘তপন’ নামে পরিচিত ছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

একাত্তরের চার ছাত্রনেতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, মুজিব বাহিনীর ভূমিকা এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে তাদের অবদান আজও বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় আলোচিত ও বিতর্কিত একটি অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Kishori
লেখক / প্রতিবেদক

Kishori

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।