আজ বিশ্বকর্মা পূজা, জানুন দেবশিল্পীর আরাধনার ইতিহাস ও তাৎপর্য

আজ বিশ্বকর্মা পূজা, জানুন দেবশিল্পীর আরাধনার ইতিহাস ও তাৎপর্য
উপবেদ, স্থাপত্যবেদ ও চতুঃষষ্টিকলার প্রকাশক প্রযুক্তি বিদ্যার দেবতা শ্রীবিশ্বকর্মা

বিশ্বকর্মা পূজা বা বিশ্বকর্মা জয়ন্তী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। হিন্দু ঐতিহ্যে বিশ্বকর্মাকে দেবশিল্পী, স্থপতি ও নির্মাণকুশলতার প্রতীক হিসেবে সম্মান করা হয়। বিশেষ করে কলকারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারিগরি ও নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের মধ্যে এই পূজার প্রচলন বেশি।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বিশ্বকর্মা দেবতাদের বিভিন্ন স্থাপনা, নগরী, রথ ও অস্ত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাভারত ও পুরাণের বিভিন্ন কাহিনিতে তাঁর স্থাপত্য ও কারিগরি দক্ষতার উল্লেখ পাওয়া যায়। দ্বারকা নগরী, লঙ্কা, পাণ্ডবদের মায়াসভা এবং দেবতাদের বিভিন্ন অস্ত্র ও বাহন নির্মাণের কৃতিত্বও পৌরাণিক বর্ণনায় বিশ্বকর্মাকে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে তাঁকে দেবতাদের স্থপতি বা ‘দেবশিল্পী’ বলা হয়।

বাঙালির বিশ্বকর্মা পূজা মানেই উৎসবের আবহ

বাংলার সংস্কৃতিতে বিশ্বকর্মা পূজার সঙ্গে দুর্গাপূজার আগমনী আবহও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ভাদ্র মাসের শেষদিকে বিশ্বকর্মা পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় অনেকের কাছে এটি শরৎ ও দুর্গোৎসবের আগমনের বার্তা বহন করে।

বিশ্বকর্মা পূজার আরেকটি পরিচিত অনুষঙ্গ হলো ঘুড়ি ওড়ানো। একসময় এই দিনে শহর ও গ্রামের আকাশে রঙিন ঘুড়ির সমারোহ দেখা যেত। আধুনিক সময়ে ঘুড়ি ওড়ানোর সেই ব্যাপকতা কিছুটা কমলেও ‘ভো-কাট্টা’ নিয়ে আনন্দ এখনো অনেকের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

অন্য পূজা থেকে বিশ্বকর্মা পূজার তারিখ আলাদা কেন?

বিশ্বকর্মা পূজার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—এর প্রচলিত তারিখ নির্ধারণে সৌর সংক্রান্তির গুরুত্ব রয়েছে। হিন্দু ধর্মের বহু উৎসবের তারিখ চন্দ্রভিত্তিক তিথি অনুসারে নির্ধারিত হলেও বিশ্বকর্মা পূজা মূলত সূর্যের রাশিপরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সূর্য সিংহ রাশি থেকে কন্যা রাশিতে প্রবেশ করার সময়কে কন্যা সংক্রান্তি বলা হয়। এই সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করেই বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশ্বকর্মা পূজার আয়োজন করা হয়। ফলে ইংরেজি ক্যালেন্ডারে এর তারিখ সাধারণত ১৬ বা ১৭ সেপ্টেম্বরের কাছাকাছি পড়ে।

এই সৌরভিত্তিক হিসাবের কারণেই লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতীপূজা কিংবা দুর্গাপূজার মতো প্রতিবছর চন্দ্রতিথি অনুযায়ী তারিখ পরিবর্তন না হয়ে বিশ্বকর্মা পূজা সাধারণত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয়।

ভাদ্র সংক্রান্তির সঙ্গে সম্পর্ক

বাংলা সৌর পঞ্জিকার হিসাবে ভাদ্র মাসের শেষ দিনকে কেন্দ্র করে কন্যা সংক্রান্তি পালিত হয়। এই সংক্রান্তির সময়েই বিশ্বকর্মার আরাধনার প্রচলন রয়েছে। সূর্যের অবস্থান ও সৌর পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী ইংরেজি বর্ষপঞ্জিতে তারিখটি সামান্য এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতে পারে।

এ কারণেই ‘বিশ্বকর্মা পূজা মানেই ১৭ সেপ্টেম্বর’—এমন একটি প্রচলিত ধারণা তৈরি হয়েছে। যদিও পঞ্জিকা ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সৌর গণনার পার্থক্যের কারণে কোনো কোনো বছরে তারিখে সামান্য পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

কারিগরি ও শিল্পজগতের সঙ্গে বিশ্বকর্মা পূজা

বিশ্বকর্মা পূজার সঙ্গে শ্রম, কারিগরি দক্ষতা, শিল্প ও নির্মাণকাজের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। কলকারখানা, ওয়ার্কশপ, গ্যারেজ, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, কারিগরি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মস্থলে যন্ত্রপাতি ও কর্মস্থল পরিষ্কার করে পূজার আয়োজন করা হয়।

বিশ্বাস অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্র ও যন্ত্রপাতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং সাফল্য ও নিরাপত্তার জন্য দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আশীর্বাদ কামনা করাই এই পূজার অন্যতম উদ্দেশ্য।

ঘুড়ির রঙে উৎসবের আকাশ

বিশ্বকর্মা পূজার সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানোর ঐতিহ্য বিশেষ করে বাংলার সংস্কৃতিতে আলাদা মাত্রা তৈরি করেছে। পূজার দিন ছাদে ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো, সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া এবং আকাশে প্রতিযোগিতার আনন্দ একসময় উৎসবের অপরিহার্য অংশ ছিল।

সময় বদলেছে, প্রযুক্তি ও নগরজীবনের ব্যস্ততায় সেই আয়োজন অনেক জায়গায় কমেছে। তবুও বিশ্বকর্মা পূজা এলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে শরতের নীল আকাশ, রঙিন ঘুড়ি এবং দুর্গাপূজার আগমনী আবহ।

দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা

বাংলার মানুষের কাছে বিশ্বকর্মা পূজা শুধু দেবশিল্পীর আরাধনা নয়; এটি বৃহত্তর শারদীয় উৎসবের সূচনাপর্বের সঙ্গেও জড়িত। বিশ্বকর্মা পূজার পরই দুর্গাপূজার প্রস্তুতি আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তাই ভাদ্রের শেষভাগে বিশ্বকর্মার আরাধনা যেন বাঙালির মনে শারদীয় উৎসবের অপেক্ষা আরও বাড়িয়ে দেয়।

ধর্মীয় বিশ্বাস, কারিগরি ঐতিহ্য ও বাংলার লোকসংস্কৃতির সমন্বয়ে বিশ্বকর্মা পূজা আজও একটি স্বতন্ত্র উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।