উপমহাদেশের নারী শিক্ষার আলোকবর্তিকা পাইকগাছার ‘ভুবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়’

উপমহাদেশের নারী শিক্ষার আলোকবর্তিকা পাইকগাছার ‘ভুবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়’
নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্মের প্রায় ৩০ বছর আগে, তৎকালীন সমাজ-বাস্তবতার অন্ধকার ভেদ করে নারী শিক্ষার যে আলো জ্বলে উঠেছিল খুলনার পাইকগাছায়, তার নাম ‘রাড়ুলী ভুবন মোহিনী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়’।
বাংলাদেশের প্রথম এবং ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় বাঙালি নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এই গৌরবময় বিদ্যাপীঠটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য স্মারক। তবে সুদীর্ঘ ১৭৫ বছরের পথচলায় আজ নানা অবহেলা, অবকাঠামোগত সংকট আর সীমাবদ্ধতায় ধুঁকছে দেশের এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি।
তৎকালীন সময়ে একবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রাড়ুলী গ্রামে বেড়াতে আসেন। তিনি তখন আচার্য পিসি রায়ের বাবা হরিশ চন্দ্রকে নারী শিক্ষার উন্নয়নে একটি আলাদা নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য তাগিদ দেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনুপ্রেরণায় হরিশ্চন্দ্র নিজ গ্রাম রাড়ুলীতেই তাঁর স্ত্রীর নামে ভুবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি বিদ্যালয়ে প্রথম ছাত্রী হিসেবে তাঁর স্ত্রী ভুবন মোহিনীকেই ভর্তি করেন। এটিই বাংলাদেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন অনেক জ্ঞানী গুণি মানুষ।
‎১৮৫০ সালে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার কপোতাক্ষ নদ তীরের ঐতিহ্যবাহী রাড়ুলী গ্রামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের (পিসি রায়) জন্মের ১১ বছর আগে তাঁর দূরদর্শী পিতা হরিশ্চন্দ্র রায় নিজ স্ত্রী ভুবন মোহিনী দেবীর নামে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন।
তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে দাঁড়িয়ে নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার লক্ষ্যেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠালগ্নে স্কুলটি প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠদান শুরু করলেও পরবর্তীতে তা মাধ্যমিকে উন্নীত হয়।
উপমহাদেশের প্রথম দিকের এই বালিকা বিদ্যালয়টি কেবল প্রাচীনত্বের দিক থেকেই অনন্য নয়, শিক্ষার মানেও এখনো উজ্জ্বল। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। পর্যাপ্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাব সত্ত্বেও বিগত কয়েক বছর ধরে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক পরীক্ষায় (এসএসসি) শতভাগ পাসের গৌরব ধরে রেখেছে। এখানকার ছাত্রীরা গর্ব প্রকাশ করে জানায়, দেশের সর্বপ্রাচীন নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে পেরে তারা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।
‎শত বছরের প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠটির মূল আক্ষেপ এর অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা নিয়ে। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও বিদ্যালয়টি এখনো জাতীয়করণ (সরকারি) করা হয়নি। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা এবং সমাজসেবীদের মতে, বিজ্ঞানী পিসি রায়ের পরিবারের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটির যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। দেশের প্রথম নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ও স্মৃতি ধরে রাখতে অবিলম্বে একে জাতীয়করণের আওতায় আনা জরুরি।
‎বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে দুই শতোর উপরে জন ছাত্রী, ১৫ জন শিক্ষক- শিক্ষিকা এবং ৪জন কর্মচারী রয়েছেন। ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে এর উল্লেখযোগ্য কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা জাতীয়করণ হয়নি। এটি জাতীয়করণের জন্য স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন।
বিদ্যালয়টির শিক্ষক, অভিভাবক ও পরিচালনা পর্ষদ মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও জাতীয়করণ নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যালয়টি তার গৌরবময় ইতিহাসকে ধারণ করে দেশের নারী শিক্ষায় আরও বড় অবদান রাখতে পারবে। এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের দিকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত সুদৃষ্টি দেবেন—এমনটাই এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
ACP
লেখক / প্রতিবেদক

ACP

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।