বর্তমান বৈশ্বিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রচিন্তা, আধুনিক বিজ্ঞান এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ভিত্তি তৈরিতে যে কয়েকটি দেশ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে, ফ্রান্স তার অন্যতম। সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কতিপয় অন্ধকার দিক থাকা সত্ত্বেও, মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে ফরাসিদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তব অবদান অনস্বীকার্য। চিন্তার স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং প্রাত্যহিক রুচির বিকাশে ফ্রান্স শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছে।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে যে প্রজ্ঞান্দোলন বা আলোকায়ন (Enlightenment) ঘটেছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ফ্রান্স। রেনে দেকার্তের বিখ্যাত দার্শনিক দর্শন “আমি চিন্তা করি, তাই আমি বিদ্যমান”—মানুষকে অন্ধবিশ্বাসের বদলে নিজের যুক্তি ও বুদ্ধির ওপর ভরসা করতে শেখায়। ভলতেয়ার, রুশো কিংবা মন্তেস্কিয়ুর মতো মননশীল চিন্তাবিদরা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গণতন্ত্র, মৌলিক মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের রূপরেখা প্রকাশ করেন।
১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেয়। বিপ্লবের মূলমন্ত্র—‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব’—কেবল ফ্রান্সের রাজতন্ত্রেরই অবসান ঘটায়নি, বরং বিশ্বজুড়ে সংবিধানভিত্তিক শাসনব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার নতুন অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে।
দৈনন্দিন জীবনের বিজ্ঞানেও ফরাসি বৈজ্ঞানিকদের অবদান চিরস্মরণীয়। আমাদের ব্যবহৃত মেট্রিক পদ্ধতি (মিটার, কেজি, লিটার) ফ্রান্সেরই উদ্ভাবন। এছাড়া লুই পাস্তুরের জীবাণু তত্ত্ব, পাস্তুরায়ন প্রক্রিয়া এবং জলাতঙ্কের প্রতিষেধক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব আনে, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়ে চলেছে। বিনোদন জগতেও ফরাসিদের হাত ধরে সূচিত হয়েছিল চলচ্চিত্র শিল্প; ১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ভাইদের তৈরি প্রথম বাণিজ্যিক সিনেমা প্রদর্শনী আজ বিশ্বব্যাপী এক বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে।
একসময় ইউরোপীয় কূটনীতি, উচ্চশিক্ষা ও সাহিত্যের প্রধানতম মাধ্যম ছিল ফরাসি ভাষা। সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ফরাসি ভাষাই ছিল বৈশ্বিক ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’। এমনকি রাশিয়ার অভিজাত সমাজও নিজেদের আভিজাত্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ফরাসি ভাষাকে বেছে নিয়েছিল।
তবে ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূ-রাজনীতির কারণে ফ্রান্সকে একের পর এক যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হয়েছে। ১৭৫৬-১৭৬৩ সালের ‘সাত বছরের যুদ্ধে’ পরাজিত হয়ে উত্তর আমেরিকায় নিজেদের বিশাল সাম্রাজ্য ‘নিউ ফ্রান্স’ ব্রিটেনের কাছে হারাতে হয়, যা ফরাসি আধিপত্যে বড় আঘাত হানে। পরবর্তীতে ১৮০৩ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট অর্থসংকটে পড়ে ৮ লক্ষ ২৮ হাজার বর্গমাইলের ‘লুইজিয়ানা’ অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দেন। এই বিশাল ও উর্বর ভূখণ্ড পেয়েই আমেরিকা পরবর্তীতে অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ পায়।
পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ও মার্কিন শক্তির উত্থানে আন্তর্জাতিক ভাষা ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ইংরেজি চলে আসলেও ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব মুছে যায়নি। বর্তমানে সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বেশ কিছু দেশ এগিয়ে গেলেও, মানবাধিকার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শিল্প, ফ্যাশন এবং খাদ্যসংস্কৃতিতে ফ্রান্স আজ আধুনিক সভ্যতার এক মূল স্তম্ভ হিসেবে গণ্য হয়।





