আজ আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি অবসান দিবস

আজ আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি অবসান দিবস

আজ আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি অবসান দিবস। সারা বিশ্বের জোরপূর্বক চুপ করিয়ে দেয়া শিল্পী, সাংবাদিক, সঙ্গীতজ্ঞ এবং লেখকদের জন্যে ন্যায়বিচার দাবি করে আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি অবসান দিবস ২০১১ সালের ২৩শে নভেম্বর তারিখে এই দিবসের প্রথম সূচনা করে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করে যাওয়া সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিডম অব এক্সপ্রেসন এক্সচেঞ্জ’ বা আইফেক্স ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিডম অব এক্সপ্রেসন এক্সচেঞ্জ (আইএফইএক্স)।

বিশ্বজুড়ে বাকস্বাধীনতা সঙ্কুচিত হবার একটি বড় কারণ হচ্ছে অপরাধীদের দায়মুক্তি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া প্রতি ১০টি অপরাধের মাত্র একটিতে সাজা পাচ্ছে অপরাধী। ফলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনকে দিন। বিচারহীনতার এ সংস্কৃতি বন্ধ করার জন্যই প্রতি বছর জাতিসংঘের স্বীকৃত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে টু এন্ড ইমপিউনিটি ফর ক্রাইমস এগেইনস্ট জার্নালিস্টস’ দিবস পালিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

প্রাথমিকভাবে ‘ম্যাগিনদানাও হত্যাকাণ্ড’কে স্মরণ করতে ২৩ নভেম্বর দায়মুক্তি রোধের আন্তর্জাতিক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পরে ২০১৩ সালে ২রা নভেম্বর দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সে বছর নভেম্বরের এই দিনটিতে মালিতে ভারলন এবং দুপন্ত নামকে দুজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়, যে ঘটনার পেছনে দেশটির একটি শীর্ষ রাজনৈতিক দল এবং আল কায়েদার হাত ছিল। আজ অবধি এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি মালি পুলিশ। সে বছরই ডিসেম্বরে আইফেক্সের তদবিরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক সভায় ২রা নভেম্বরকে আন্তর্জাতিকভাবে দায়মুক্তি রোধ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একজন সাংবাদিক হত্যার পেছনে কোনো না কোনোভাবে জড়িত থাকে সে দেশের ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দল কিংবা ব্যক্তি। ফলে, আদালত পর্যন্ত পৌঁছলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো সুবিচার পেতে পারে না। আইফেক্সের আশা, তারা প্রতি বছর দায়মুক্তি রোধ দিবস পালনের মাধ্যমে বিচার না হওয়া মৃত্যুগুলো নিয়ে বিশ্বজুড়ে এমনভাবে সর্বসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে যেন, বিচারে অনীহা প্রদর্শন করা দেশগুলোর সরকারও বাধ্য হয় বিচার করতে। বলা হয়, যখন কোনো মানুষ দেশের পুলিশ প্রশাসন আর আইন আদালতে সুষ্ঠু বিচার থেকে বঞ্চিত হন, তখন তার শেষ ভরসা হয়ে পাশে দাঁড়ায় সাংবাদিকের কলম। সেই কলম-সৈনিকরাই যদি নিরাপদ না হন, তাহলে তাদের কলম কী করে সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দেবে? সাধারণ মানুষের মাঝে এরকম জনসচেতনতা ছড়িয়ে দেয়াও এই আন্তর্জাতিক দিবসটি পালনের একটি মুখ্য উদ্দেশ্য।

আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি রোধ দিবসে বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রগুলো নানা রকম কলাপ ছাপে, সম্পাদকগণ বিবৃতি প্রকাশ করেন, বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংস্থা আর সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো নিজেদের মতো করে কর্মসূচী দেয়। এতে করে সরকারি কিংবা প্রভাবশালীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপে যেসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়, সেগুলো নিয়ে পুনরায় আলোচনা করতে অনুপ্রাণিত হয় সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষও। ফলে চাপা পড়ে যাওয়া সত্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এদিন নিজ নিজ দেশের সরকারের নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া সাংবাদিক হত্যার বিচার করার দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি পাঠানো হয়। জতিসংঘও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে যেসব দেশে সাংবাদিক হত্যার বিচারে দায়মুক্তির হার বেশি, সেসব দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারকলিপি প্রেরণ করে। পরের বছর সে সকল দেশে হত্যাকাণ্ডের বিচারের কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, সে সংক্রান্ত তথ্যপঞ্জি প্রকাশ করে বৈশ্বিক এ সংস্থাটি। ফলে, বিশ্ব রাজনীতিতে ইমেজ সংকটে পড়বার ভয়ে হলেও বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানগণ সাংবাদিক হত্যাগুলোর সুষ্ঠু বিচার করবার চেষ্টা করে থাকেন।

প্রতি বছর আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি রোধ দিবসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সব সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডকে স্মরণ করা হয় আর সেসব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করা হয়, যেন অপরাধী পুনরায় একই অপরাধের সুযোগ না পায়, কিংবা অন্য কেউ সে অপরাধ করতে সাহস না পায়। #EndImpunity, #JournoSafe আর #TruthNeverDies হ্যাশট্যাগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও সচেতনতামূলক আলাপ আলোচনা চলে এদিন। তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লবের এ যুগে যেকোনো অপরাধ রোধ করার প্রধান হাতিহার হচ্ছে প্রচার প্রচারণা আর সচেতনতা বৃদ্ধি। শুধু আইন প্রয়োগে সাংবাদিকদের রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই এই আন্তর্জাতিক দিবসটির গুরুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

চলতি দশকে বিশ্বজুড়ে যত সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, তার ৪৫ ভাগ হয়েছে যুদ্ধপীড়িত দেশগুলোতে, আর বাকি ৫৫ ভাগ হয়েছে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলে। যুদ্ধপীড়িত অঞ্চলগুলোর চেয়ে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলে অধিক সাংবাদিককে হত্যা করা হচ্ছে, এর চেয়ে খারাপ সংবাদ আর কী হতে পারে? এটি একদিকে যেমন পেশাজীবী সাংবাদিকদের জন্য খারাপ সংবাদ, অন্যদিক এটি নির্দেশ করে সাংবাদিকের কলমের গতিরোধ করা জন্য অপরাধীদের সক্রিয়তা বৃদ্ধিকেও। তাই সাংবাদিক হত্যার আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি রোধ দিবস একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিবসকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, বিচার হবে প্রতিটি অযাচিত হত্যার, নিরাপদ হবে কলম সৈনিকদের পেশা, এরকমটাই প্রত্যাশা সকলের।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
সংবাদ প্রতিনিধি

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।