রাজা প্রতাপাদিত্য’র আবিষ্কৃত অন্যতম দৈবমন্দির শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির

রাজা প্রতাপাদিত্য’র আবিষ্কৃত অন্যতম দৈবমন্দির শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গোপালপুর মহাপ্রতাপশালী মহারাজা প্রতাপাদিত্য’র আবিষ্কৃত অন্যতম ঐতিহাসিক দৈবমন্দির ঐতিহাসিক শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দির।

রাজা প্রতাপাদিত্যর কাকা বসন্ত রায় প্রতাপকে যশোর রাজ্যের যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ততকালীন সম্রাটের প্রধান সেনাপতি মান সিংহের তত্বাবধানে দিল্লীতে পাঠান। প্রতাপ সেখানে ৩ বছর ছিলেন।এই সময়ে তিনি প্রচুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন ছাড়াও সম্রাটের হিন্দু অমত্যাগণের সহায়তায় সমগ্র যশোর রাজ্যের বাদশাহী সনদ লাভ করেন।ঐ সময়ে উড়িষ্যা অভিযানের সময়ে ততকালীন সেনা বাহিনীর প্রধান সেনাপতি মানসিংহ প্রতাপকে সংগে নিয়ে গিয়েছিলেন।উড়িষ্যা জয় করে ফেরার সময়ে ভারতের উঠিষ্যার রাজ্যের ভুবনেশ্বর পুরী হতে স্বর্ণ নির্মিত শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দের যুগল বিগ্রহ নিয়ে আসেন।

রাজা বসন্ত রায় যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে গোপালপুর গ্রামে মন্দির নির্মাণ করেন।শ্রী রাধা গোবিন্দ যুগল বিগ্রহে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ মন্দিরে পূজা অর্চনা ও সেবা কার্য পরিচালনার জন্য মন্দিরের নামে ২৮৬ বিঘা জমি উইল করে দিয়ে যান। মূল মন্দিরটি ৬ বিঘা ৫ শতক জায়গার উপর প্রতিষ্ঠা করেন।কিছুদিন পর প্রতাপের হাতে রাজা বসন্ত রায় স্বপরিবারে নিহত হন।পরবর্তীতে বসন্ত রায়ের আত্মীয়স্বজন গোলক নামের এক কুখ্যাত চোরের দ্বারা ঐ স্বর্ণ বিগ্রহ চুরি করে নিয়ে যায়। ততকালীন সময়ে দীর্ঘ এক মাস ব্যাপি মহাদোল উতসব পালিত হত। বর্তমানেও মহাদোল উতসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মন্দিরটি দুই তলা বিশিষ্ট।যাহার দেওয়াল চওড়া প্রায় ৮ ফুট এবং উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট।মন্দিরটি বর্তমানে জীর্ণ শীর্ণ ও ভগ্নাবস্থায় রয়েছে।পাশে একটি নতুন শ্রী ভগবানের গর্ব মন্দির নির্মাণ করে,পূজা অর্চনা অব্যাহত রয়েছে।

কথিত রয়েছে,মহাভারতের যুগের ঐতিহাসিক মন্দিরটি ততকালীন যমুনা নদীর তীরে অবস্হিত একটি ঐতিহাসিক,প্রাচীন ও দৈব মন্দির।বিলের মধ্যে মাটি ও স্হুপ খননের সময়ে এবং সরকারের হাল জরিপের সময়ে দাগ ও খতিয়ান সনাক্তকরণের সময়ে মন্দিরটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিলো।

মহাভারত যুগের পর কালক্রমে  বিভিন্নভাবে গোপালপুরের ঐ মন্দিরের পরিচর্যা ও কার্যনির্বাহী ভার অনেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন।রাজা বসন্ত রায় রাজা প্রতাপাদিত্য রক্ষিত ও আবিষ্কৃত এই দৈব মন্দিরটি ততকালীন সময়ে জনপ্রিয় ছিলো।

এভাবে দীর্ঘদিন থাকার পর জমিদারি এস্টেট পরিচালনার সময়ে বর্তমান সোহালিয়া,গোপালপুর নিবাসী নিমাই চাঁদ মন্ডল মন্দিরের দেখভাল,কার্যভার ও পরিচালনা করতেন।মন্দিরের পুরোহিত মতিলাল ঘোষাল রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পূজারী ছিলেন।বিধিঅনুসারে নিত্যদিন গোপালের পূজা করতেন।

গোপালের নামানুসারে গোপালপুর নামকরণ করা হয়।পূজারী(সেবাইত) এদের বংশধর ভারতের অবিভক্ত চব্বিশ পরগণা জেলার কুমীরমারি হয়ে পরে ছোট মোল্লাখালী ও সাতজেলিয়াতে বসবাস করছেন।গোপালপুর থেকে সোহালিয়া পর্যন্ত ঐ রাস্তা নিমাই চাঁদ মন্ডল নিজের জমির উপর দিয়ে তৈরী করেন। জমিদার হরিচরণ বাবুর জমিদারিত্বে ৬০০ বিঘা সম্পত্তির মালিক ছিলেন নিমাই চাঁদ মন্ডল।উনি ষোলোটি মৌজার ষোল আনা সম্মানের মোড়লও ছিলেন।হরিতলা নামকরণ করা হয়েছিল পন্ডিত হরিদাস সিদ্ধার্ন্তবাগীসের নামানুসারে,নাম হয় হরিতলা। যেখানে ততকালীন সময়ে হরিতলায় সংস্কৃত টোল পড়ানো হতো। হরিতলার পন্ডিত হরিদাস সিদ্ধার্ন্তবাগীসের স্নেহভাজন ছাত্র মোড়ল নিমাই চাঁদ মন্ডলের বড় ছেলে গোপাল মন্ডলের দ্বিতীয় পুত্র শ্রী ধরণীধর মন্ডল ১৯২৪ সালে যশোর মহকুমা খুলনা জেলার প্রথম ছাত্র হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত দ্বিতীয় বিভাগে কলাপ পাশ করেছিলেন।গোপালপুর থেকে সোহালিয়া পর্যন্ত ঐ রাস্তা নিমাই চাঁদ মন্ডল নিজের জমির উপর দিয়ে তৈরী করেন।নাহলে রাস্তা কাছারী বাড়ীর থেকে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরের ওখান থেকে দেবীপুর হয়ে সোহালিয়া ছিলো।এভাবে আবার দীর্ঘদিন থেমে থেকে আবারও মন্দিরের জায়গা উদ্ধার নিয়ে জল্পনা কল্পনার অবসান হয়ে মন্দিরটি পুনঃজাগরণ ঘটেছে।

বর্তমানে বিভিন্ন সংগঠন,সম্প্রদায়,সনাতনী নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে কার্যনির্বাহী কমিটি পরিচালনার দ্বারা গোপালপুর শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দির পরিচালিত হচ্ছে।স্হানীয়,উপজেলা,জেলাসহ বিভিন্ন ইউনিট,সংগঠন সনাতনী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে মন্দিরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির মধ্যে শ্রী শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর আবির্ভাব,মহাদোল যাত্রা,শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা,ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী,শ্রী শ্রী রাধাষ্টমী,ঝুলন যাত্রা,অক্ষয় তৃতীয়াসহ হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান ভাব গাম্ভীর্যের সহিত পালন ও অনুষ্ঠানাদি আয়োজন করা হয়।প্রতিদিন শ্রী মদভ্গবত গীতা পরায়ণ ও শ্রী মদভ্গবত গীতা পাঠ অব্যাহত রয়েছে।ঐতিহাসিক এই দৈব মন্দিরে শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা এবং শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী জন্মাষ্ঠমীতে প্রায় ১২-১৫ হাজার ভক্ত সমাগম হয়ে থাকে।এছাড়া শ্রীধাম নবদ্বীপ মায়াপুর,শ্রীক্ষেত্র,শ্রীধাম বৃন্দাবন, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্হান থেকে ভক্তবৃন্দের সমাগম হয়ে থাকে।প্রতিদিন পাঁচবার শ্রী ভগবানের ভোগরাগ ও আরতি করা হয়।প্রতি শুক্রবার আগত সকল ভক্তবৃন্দের অন্ন প্রসাদ দান করা হয়।প্রতি শুক্রবার গীতা শিক্ষা দান করাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ঐতিহাসিক মন্দিরটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকলেও মূল মন্দিরের নামের মোট জমির ২ একর ৫ শতকের মধ্যে নিজর্স্ব জমির আরো ১৭ শতক জমি বেদখলে রয়েছে।সমগ্র মন্দিরের নামে ২৮৬ বিঘা জমির ২৮০ বিঘা জমি বেদখলে রয়েছে।মূল মন্দিরের নামের এখনও ১৭ শতক জমি বেদখল হয়ে আছে।অবিলম্বে এই ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দিরের দখলকৃত সকল জায়গা উদ্ধার হওয়া দরকার।

অবিলম্বে ঐতিহাসিক এই মন্দিরের সকল জমির পবিত্র ভূমি উদ্ধার করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে,উদ্ধার করা জরুরী।

সরকারী-বেসরকারী উদ্দ্যোগে রাধা গোবিন্দ মন্দিরের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।এই মন্দিরটিতে আকর্ষণীয়,সুদর্শনীয় ও নান্দনিক দৃশ্যায়নের সুস্বজ্জিত নাট মন্দির,ছাত্র ছাত্রীদের থাকার জন্য স্হায়ী হোস্টেল ও ক্যান্টিন,নিরাপত্তা বেষ্টিত সীমানা প্রাচীর,দূরাগত সকল ভক্তবৃন্দের থাকার জন্য রাত্রি যাপনের জন্য সুউচ্চ আবাসিক ভবন,আন্তর্জাতিক মানের ভিআইপি গেস্ট হাউস নির্মাণের কর্ম পরিকল্পনা রয়েছে।তবে সামগ্রিক বিষয়াদি ও প্রকল্পের কাজগুলো অত্যন্ত ব্যায়বহুল।

সরকারী-বেসরকারী সহায়তার পাশাপাশি অনেক ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিবর্গের আর্থিক সহায়তা ও অনুদান প্রদানের সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।ঐতিহাসিক গোপালপুর শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ সার্বজনীন মন্দিরটি যাতে জাতীয়করণ ও আন্তর্জাতিক মানের তীর্থক্ষেত্র হয় সেইলক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারী উদ্দ্যোগের পাশাপাশি সকল ভক্তমন্ডলী,শ্রেণীপেশার মানুষদের এগিয়ে আসা উচিত।তাহলে গোপালপুর ঐতিহাসিক সার্বজনীন শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দিরটি আন্তর্জাতিক মানের তীর্থক্ষেত্রে রুপান্তরিত হবে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।