আজ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য—“Honouring Indigenous Midwives: Safeguarding Life and Well-being”, যার ভাবার্থ ‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানানো: জীবন ও সুস্থতা রক্ষা করা’। এবারের প্রতিপাদ্য শুধু আদিবাসী ধাত্রীদের অবদানের স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান, নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও মর্যাদার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
আদিবাসী সমাজে ধাত্রীরা যুগের পর যুগ মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রসবকালীন সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। সন্তান জন্মদানের সময় সহযোগিতা করার পাশাপাশি তারা স্থানীয় ভেষজ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পারিবারিক সহায়তা এবং সংস্কৃতিনির্ভর স্বাস্থ্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাদের ভূমিকা একটি শিশুর জন্মদানের সহায়তার চেয়েও অনেক বিস্তৃত। এটি একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সঞ্চিত জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। এর ফলে একদিকে যেমন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা মূল্যবান জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে আদিবাসী নারীদের জন্য সাংস্কৃতিকভাবে উপযোগী ও সহজলভ্য মাতৃস্বাস্থ্যসেবাও অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাই আদিবাসী ধাত্রীদের স্বীকৃতি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের জ্ঞানকে সম্মানের সঙ্গে সংরক্ষণ করাও জরুরি।
আদিবাসীদের অধিকার ও জীবনযাত্রার প্রশ্নে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে ভূমি নিছক অর্থনৈতিক সম্পদ নয়। ভূমির সঙ্গে তাদের পরিচয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং অস্তিত্ব গভীরভাবে যুক্ত। কৃষি, বনজ সম্পদ, পশুপালন, নদী-জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল মৎস্য আহরণসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যগত পেশা তাদের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
কিন্তু ভূমি দখল, জলাশয় সংকোচন, বন উজাড়, উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ও সামাজিক বৈষম্য তাদের ঐতিহ্যগত জীবনব্যবস্থাকে ক্রমেই সংকুচিত করছে। নিজেদের ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে কৃষি, পশুপালন ও মৎস্যভিত্তিক জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্যনিরাপত্তা, আয়, কর্মসংস্থান ও জীবনমানের ওপর। একই সঙ্গে ক্ষয় হচ্ছে তাদের সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত জ্ঞান।
এই বাস্তবতায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। সাংবিধানিক স্বীকৃতি কোনো অনুগ্রহ বা বিশেষ সুবিধা নয়; এটি তাদের পরিচয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রে অবদানের মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি। সংবিধান সংস্কার বা পরিমার্জনের যে কোনো উদ্যোগে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও পরিচয়ের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু সাংবিধানিক স্বীকৃতিই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রীয় নীতি, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত তাদের প্রতিনিধিত্ব ও মতামতের যথাযথ প্রতিফলন প্রয়োজন। তাদের জীবন, ভূমি, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না। সহজ ভাষায়, ‘তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া নয়’—এই নীতিকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি করা প্রয়োজন।
উন্নয়নের ধারণাটিও এ ক্ষেত্রে নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। এমন উন্নয়ন, যার কারণে ভূমি হারাতে হয়, পরিবেশ ধ্বংস হয় কিংবা একটি জনগোষ্ঠী তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাকে টেকসই উন্নয়ন বলা কঠিন। পরিকল্পনাহীন পর্যটন, নির্বিচার ভূমি ব্যবহার, বন ও জলাভূমি ধ্বংসের পরিবর্তে প্রয়োজন পরিবেশসম্মত ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, ক্ষুদ্র ও কুটির উদ্যোগ এবং সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটনের মতো খাতে টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। একই সঙ্গে তাদের ভূমির অধিকার, পরিবেশগত নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস পালন নয়। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—উন্নয়নের সুফল এবং রাষ্ট্রীয় অধিকার কি সব জনগোষ্ঠীর কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে?
আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানানো থেকে শুরু করে তাদের ভূমি, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা—সবকিছু একই বৃহত্তর ন্যায়বিচারের অংশ। একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রে কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়, জ্ঞান ও অধিকার যেন উন্নয়নের চাপে হারিয়ে না যায়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তাই শুধু তাদের অবদানের প্রশংসা নয়, বরং তাদের অধিকার, মর্যাদা, অংশগ্রহণ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার বাস্তব পদক্ষেপই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়।



