বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার অংশ হিসেবে প্রতিটি বিভাগে মডেল খাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এমপি।
সচিবালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নিজ দপ্তরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি আজ এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আগামী বছর পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ২০টি খালকে ‘মডেল খাল’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এসব খালে শুধু পানি নিষ্কাশন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নয়, খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ, মাছ চাষ ও হাঁস পালনের মতো সমন্বিত কার্যক্রমও যুক্ত করা হবে। পরবর্তী সময়ে এই মডেল দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বভার গ্রহণের পর এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনার আলোকে পানি সম্পদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং কৃষিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, গত বছর তার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে আগাম বৃষ্টি ও দায়িত্ব গ্রহণে বিলম্বের কারণে পুরো লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ সময়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘গত বছর আমাদের ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। আমরা প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার খনন করতে পেরেছি। বর্ষার কারণে কিছু কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এ বছর আমরা নতুন করে পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি।’
তিনি জানান, চলতি বছর দেশের সব উপজেলায় খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে উপজেলা ভিত্তিক প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত খালগুলোর তালিকা এখন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে অক্টোবরের মধ্যে খাল খননের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট প্রস্তুত করা হবে। এরপর বরাদ্দ দিয়ে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে।
দুর্যোগমন্ত্রী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে খাল খননের কাজ করলে একদিকে কাজের মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বর্ষা শুরুর আগেই খননকাজ শেষ করা যাবে। তাই নভেম্বর থেকে কাজ শুরু করে ফেব্রুয়ারির মধ্যে খাল খননের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নভেম্বরে যখন পানি কমে যাবে, খাল শুকনা থাকবে, তখন আমরা খননকাজ শুরু করব। ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করতে চাই। কারণ এরপর বর্ষা চলে এলে খাল খননের কাজ সঠিকভাবে করা সম্ভব হয় না। অতীতে বর্ষার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে।’
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০০টি খালকে মডেল খাল হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব পাওয়া গেছে। তবে সব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে না। যাচাই-বাছাই শেষে সেখান থেকে ২০টি খালকে নির্বাচন করা হবে। প্রতিটি বিভাগ থেকে মডেল খাল নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রত্যেক বিভাগে আমরা মডেল খাল করব। এগুলো পাইলট স্কিম হিসেবে বাস্তবায়ন করা হবে।
মডেল খাল প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, শুধু পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল খনন করলেই হবে না। খালকে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সে জন্য খালের পাড়ে গাছ লাগানো, খালে মাছ চাষ এবং হাঁস পালনের ব্যবস্থা করা হবে। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘খালের পাড়ে গাছ লাগাবো, মাছ চাষ করব, হাঁস চাষ করব। মাছে-ভাতে বাঙালি এই বিষয়টিকে খালের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে চাই। একটি খালকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কীভাবে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করা যায়, সেটিই হবে মডেল খাল প্রকল্পের লক্ষ্য।’
খাল খননের বহুমুখী সুফলের কথা তুলে ধরে আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। অপরিকল্পিতভাবে খাল ভরাট ও খালের নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। এতে কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, খালগুলো পুনঃখনন করা হলে বর্ষা মৌসুমে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে খালে পানি ধরে রাখা যাবে। সেই পানি ব্যবহার করে কৃষকরা সেচ সুবিধা নিতে পারবেন। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনও বাড়বে।
মন্ত্রী বলেন, ‘খাল খননের মাধ্যমে দ্রুত পানি নিষ্কাশন হবে। আবার শুকনা মৌসুমে পানি ধরে রাখা হবে। সারফেস ওয়াটারের মাধ্যমে কৃষকদের সহযোগিতা দেওয়া যাবে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং জলাবদ্ধতার সমস্যাও কমবে।’
তিনি আরও বলেন, খাল খননের সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে। খনন কাজে স্থানীয় শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করার ফলে হতদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ছে।
খাল খনন কর্মসূচি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি বড় উদ্যোগ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এর ফলে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে এবং জিডিপিতেও তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
খাল খনন কর্মসূচির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে খাল খনন কর্মসূচির সূচনা হয়েছিল। ওই সময় বাংলাদেশ খাদ্য ঘাটতির মধ্যে ছিল। খাল খননের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটিয়ে খাদ্য উৎপাদনে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি সে সময় দেশের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন এ কর্মসূচি বন্ধ থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় খালগুলো ভরাট হয়ে যায় বা নাব্যতা হারায়। এর ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।
দুর্যোগমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই খাল খনন বিপ্লব শুরুর পর খাদ্য উৎপাদন বেড়েছিল এবং এক পর্যায়ে খাদ্য রপ্তানিও হয়েছিল। দীর্ঘ বছর এই যুগান্তকারী কর্মসূচি বন্ধ ছিল।
তিনি আরও বলেন, খাল পুনঃখননের মাধ্যমে অতিবৃষ্টি ও বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পাশাপাশি কৃষিজমি রক্ষার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে কৃষক সময়মতো রোপা লাগাতে পারেন না, সেখানে খাল পুনঃখনন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, গোটা বাংলাদেশই দীর্ঘদিন অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় দেশের সব অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।




