১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম নেয়। দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পাঞ্জাব ও বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ নিহত হন, বাস্তুচ্যুত হন এবং লাখ লাখ পরিবারকে জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দাবির ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম হলেও রাষ্ট্রটির অভ্যন্তরে শুরু থেকেই ভাষা, জাতিসত্তা, প্রাদেশিক অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন দেখা দেয়।
এই বিরোধ পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
পূর্ব বাংলার বাঙালিদের ক্ষোভ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই পূর্ব বাংলার সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার বিরোধ প্রকাশ পেতে শুরু করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৪৮ সাল থেকেই আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় চেতনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়।
এরপর অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক ক্ষমতার অসম বণ্টন এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন বিস্তৃত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়।
দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাই কেবল একটি ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ছিল না; এর পেছনে ছিল ভাষা, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা ও আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ আন্দোলন।
বেলুচিস্তান ও পশতুন অঞ্চলে ভিন্ন বাস্তবতা
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রাদেশিক ও জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্নটি দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অসন্তোষ ও সশস্ত্র বিদ্রোহ রয়েছে। স্বাধীনতাকামী বিভিন্ন বেলুচ সংগঠন পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং সাবেক ফাটা অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক অভিযান, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসী হামলা এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে।
পশতুন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এসব অঞ্চলে পরিচালিত সামরিক অভিযানকে সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
অর্থাৎ সংঘাতটির পেছনে শুধু ধর্মীয় কারণ নেই। জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পদের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।
ধর্মের নামে রাষ্ট্র, কিন্তু ধর্মীয় সহিংসতা থেকে মুক্ত নয়
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক ভিত্তির অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক রাষ্ট্রের ধারণা। কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কয়েক দশক পরও ধর্মীয় বিভাজন পাকিস্তানের বড় সংকটগুলোর একটি হয়ে আছে।
শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত, আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর বৈষম্য, হিন্দু ও খ্রিস্টানসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা—বিভিন্ন সময়ে এসব ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে।
ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—শুধু অভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় কি একটি রাষ্ট্রের সব নাগরিকের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক স্বার্থকে একীভূত করতে পারে?
পাকিস্তানের ইতিহাস সেই প্রশ্নের একটি জটিল উদাহরণ।
মসজিদে হামলার শিকারও মুসলমান
কোহাটের সর্বশেষ হামলার সবচেয়ে নির্মম দিক হলো—হামলাটি হয়েছে মুসলমানদের নামাজের সময় একটি মসজিদে।
অর্থাৎ যে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম, সেই ধর্মের অনুসারীরাই আজ দেশটির সন্ত্রাসী সহিংসতার অন্যতম প্রধান শিকার।
পুলিশ সদস্যরা যখন জুমার নামাজে ছিলেন, তখনই বিস্ফোরণে তাঁদের অনেকের প্রাণ যায়। সাধারণ মুসল্লিরাও রেহাই পাননি।
এ ঘটনা পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি জঙ্গিবাদী সহিংসতার আদর্শিক সংকটও সামনে নিয়ে আসে। কারণ উপাসনাস্থলে মানুষ হত্যা কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের স্বাভাবিক উপায় হতে পারে না; এটি সরাসরি বেসামরিক মানুষের জীবনের ওপর আঘাত।
আফগানিস্তান সীমান্ত ও নতুন নিরাপত্তা সংকট
খাইবার পাখতুনখাওয়া আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটি পাকিস্তানের নিরাপত্তা রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিটিপি ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলা বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের মাটিতে জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় থাকার অভিযোগ করে আসছে। কাবুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। এই পারস্পরিক অভিযোগ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্কেও উত্তেজনা তৈরি করেছে।
কোহাট হামলার পর সেই নিরাপত্তা সংকট আরও একবার দৃশ্যমান হলো।
পাকিস্তানের সামনে প্রশ্ন—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোথায়?
একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত রক্ষা বা সেনাবাহিনীর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। নাগরিকের মসজিদ, বাজার, স্কুল, হাসপাতাল কিংবা রাস্তায় নিরাপদে চলাচলের অধিকারও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ।
কোহাটের ঘটনা সেই জায়গাতেই বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
যে পুলিশ সদস্যরা অন্যদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে, তারাই যদি নিজস্ব পুলিশ লাইন্সের মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে নিহত হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
১৯৪৭ থেকে ২০২৬—সংঘাতের দীর্ঘ ছায়া
পাকিস্তানের ৭৯ বছরের ইতিহাসে দেশভাগের রক্তাক্ত স্মৃতি, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, কাশ্মীর প্রশ্ন, পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা, বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ, পশতুন অঞ্চলের অস্থিরতা, সামরিক শাসন, রাজনৈতিক সংঘাত এবং ধর্মীয় সন্ত্রাস—সবই পরস্পরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।
তবে ইতিহাসকে এক ব্যক্তির সিদ্ধান্ত বা একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। পাকিস্তানের সংকটের পেছনে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সামরিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক, জাতিগত বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক বৈষম্য, ধর্মীয় রাজনীতি এবং সশস্ত্র জঙ্গিবাদের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
কোহাটের মসজিদে বিস্ফোরণ সেই দীর্ঘ সংকটেরই নতুন রক্তাক্ত অধ্যায়।
বাংলাদেশের জন্যও রয়েছে ইতিহাসের শিক্ষা
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস প্রমাণ করে—ধর্মীয় পরিচয় ও জাতীয় পরিচয় সবসময় একই বিষয় নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান হতে পারেন এবং একই সঙ্গে বাঙালি, পশতুন, বেলুচ, কাশ্মীরি কিংবা অন্য কোনো জাতিসত্তার অংশ হতে পারেন।
রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য তাই নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা এবং আঞ্চলিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাকিস্তানের ইতিহাসে এই ভারসাম্য রক্ষা কতটা কঠিন হয়েছে, তারই ধারাবাহিক প্রতিফলন দেখা যায় খাইবার পাখতুনখাওয়া থেকে বেলুচিস্তান পর্যন্ত।





