নোয়াখালীতে পরিকল্পিত হিন্দু হত্যার ইতিহাস ও গুজবের ভয়াবহতা

নোয়াখালীতে পরিকল্পিত হিন্দু হত্যার ইতিহাস ও গুজবের ভয়াবহতা
পরিকল্পিত হিন্দু হত্যার ইতিহাস

আজ ১০ অক্টোবর গুজব ছড়িয়ে নোয়াখালী পাঁচ সহস্রাধিক হিন্দু হত্যা দিবস।  প্রায় ২০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে স্থানীয় মুসলিমদের দ্বারা সংঘটিত এক ধারাবাহিক হত্যাযজ্ঞ, হিন্দু নারী ধর্ষণ, নারী ও অল্প বয়স্ক মেয়েদের অপহরণ, হিন্দুদেরকে জোরপূর্বক মুসলিমকরন, হিন্দু সম্পদ লুট-ধ্বংস-অগ্নিসংযোগ ঘটানো হয়। সেই থেকে বর্তমান সময়ে ডিজিটাল উপায়ে ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে হিন্দু সম্প্রদায় ধ্বংসের নিয়মিত অভিযান চলছে। পরিকল্পিত হিন্দু হত্যার ইতিহাস

অন্যায় না করেও মিথ্যে অপবাদে হিন্দুদের সর্বস্ব হারাতে হয় আর যার মাধ্যমে এসব ঘটনা ঘটলো তিনি বীরদর্পে প্রকাশ্যে ঘুরে বেরায়। কোন ঘটনার বিচার না হওয়ায় ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে হিন্দু ধ্বংসের কৌশল। হারিয়ে যাচ্ছে সনাতন গোষ্ঠি।

১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসের ১০ তারিখ কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার দিন । নোয়াখালীর হিন্দুরা বাড়িতে পূজার আয়োজনে ব্যস্ত । অন্যদিকে মুসলিম লীগ নেতা-কর্মীরা প্রচার করে যে, শিখ সম্প্রদায় দিয়ারা শরীফ আক্রমণ করেছে । গুজবের ফলে আশেপাশের এলাকার মুসলিমরা দলে দলে দিয়ারা শরিফে জড় হয় । গোলাম সরোয়ার হুসেনি সমবেত মুসলিমদেরকে সাহাপুর বাজার আক্রমণ করতে নির্দেশ দেয় । কাশেম নামের আরেকজন মুসলিম লীগ নেতাও তার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে সাহাপুর বাজারে পোঁছায়, যাদের কাশেমের ফৌজ বলা হত ।

কাশেমের ফৌজ নারায়ণপুর থেকে সুরেন্দ্রনাথ বসুর ‘জামিদার অফিসের’ দিকে এগিয়ে যায় । কল্যাণনগর থেকে আসা আরেকদল দাঙ্গাবাজ মুসলিম কাশেমের ফৌজের সাথে যোগ দেয় । এদের সাথে আরও অনেক ভাড়া করে আনা মুসলিম গুণ্ডারা জামিদার অফিসে আক্রমণ করে । সামান্য প্রতিরোধের পরই সুরেন্দ্রনাথ বসু ধারাল অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হন । মুসলিম জনতা হাত-পা বেধে তাকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে । সুরেন্দ্রনাথ বসুকে মুসলিমরা আক্রমণ করেছে শুনতে পেয়ে পাশের পাঁচঘরিয়া গ্রামের ডাক্তার রাজকুমার পাল তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন । কিন্তু পথিমধ্যে তাকে মুসলিম দুর্বৃত্তরা ছুরিকাহত করে ।

হিন্দুদের জীবন কিভাবে বিভীষিকার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল তা স্মরণ করতে এখনও আঁৎকে ওঠেন বেগমগঞ্জ থানার পাঁচ গাঁও-এর মানুষ ।

“আমাদের পাশেই একটা ব্রাহ্মণ পরিবার ছিল । ওরা ছিল চার ভাই । কুরবানির দিন ওদের ঠাকুর মন্দিরের সামনে গরু কাটা হল, তারপর ঝুড়ি করে ওদের চার ভাইয়ের ঘরেই মাংস পাঠিয়ে দেওয়া হল । ওরা তো এসব দেখে একেবারে আঁৎকে উঠেছে আর কী! অনেকে ঘৃণায় বমি করতে শুরু করল । ব্যাস, আর যায় কোথায় । গ্রামের সমস্ত মুসলমান ওদের বাড়ি ঘিরে ধরল । বলল, ‘শালা মালাউন, হারামজাদা,আমাদের খোদার প্রসাদ অপমান করলি!’ বিচার বসল, ওদের শাস্তি হল । বাড়ির সব পুরুষকেনাকে খৎ দিতে হল, জরিমানা ধার্য্য হল ২৫০ টাকা ।”

নাউলির গোবিন্দপুর গ্রামের এক বৃদ্ধ সজল চোখে জানিয়েছেন কী বীভৎস মানসিক অত্যাচার তাঁদের সহ্য করতে হয়েছিল । “আমরা দু-তিন জন হিন্দু এক সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছি দেখলেই মুসলমানরা আমাদের টিটকারী দিয়ে ছড়া কাটতঃ

হিন্দু ধর্ম জানুন

“ওহে পূর্ব পাকিস্তানের বাঁশরি

দেখ, বর্ণহিন্দু কথা কয়

হাত ঠারি, মুখ ঠারি।”

নিজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে আজকের লব্ধ প্রতিষ্ঠিত জনৈক আইন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, “আমি তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি । অবাক হয়ে দেখলাম যারা আমাদের বাড়িতে কাজ করত তারা হঠাৎ আমাদের ‘তুই’ বলে সম্বোধন করতে আরম্ভ করল । কলকাতা থেকে কোন আত্মীয়-স্বজন গেলে বলত, ‘কিরে, কলকাতায় ক’টা মুসলমান মারলি’ । ওরা ইচ্ছা করেই ‘তুই’ শব্দটা ব্যবহার করত ।”

সাক্ষাৎকারের উপর ভিত্তি করে লেখা উপরেরর এই অভিজ্ঞতাগুলির মধ্যে ক্ষীণতম সত্যের অপলাপ নেই । ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত Bengal Press Advisory Committee-র রিপোর্টেও হিন্দুদের এই করুণ অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত হয়েছে । ঐ সমস্ত নথিপত্র দেখলে বোঝা যায়,নোয়াখালি ‘দাঙ্গা’র মাটি তৈরী করার জন্য কী ধুরন্ধর পরিকল্পনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল ।

১০-৯-৪৬ এ নোয়াখালির জেলাশাসককে লেখা একটি আবেদন পত্রে কিছু গ্রামবাসী জানিয়েছিলেন, “আমরা (হিন্দুরা) এখানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি । ‘কলকাতা দাঙ্গার বদলা চাই’ হুঙ্কার দিয়ে রোজই এখানে মিছিল বের করা হচ্ছে । আমাদের দোকান থেকে জিনিস না কিনবারজন্য বলা হচ্ছে । আমাদের ‘জবাই করা হবে’ বলে শাসানো হচ্ছে । আমাদেরনিরাপত্তার জন্য গ্রামে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হোক । আমরা, গ্রামবাসীরা গ্রামে পুলিশ রাখবার খরচ বহন করব!” ১৮-৯-৪৬ এ রকমই একটি ডায়েরীতে অভিযোগ করা হয়েছে, “আমাদের জীবন এখানে সুতোর উপর ঝুলছে । আমাদের সবাইকে খুন করা হবে বলে শাসানো হচ্ছে । ওরা বলছে, শুধু হাই কম্যান্ডের নির্দেশ এখনও পাওয়া যায়নি, তাই আমাদের কোতল করা হচ্ছে না ।” শুধু হুমকি দিয়েই হিন্দুমনকে ভয়ক্লিষ্ট করে তোলা হয়নি । হিন্দুদের ধর্মীয় স্থানগুলি অপবিত্র করারও ডাক দেওয়া হয়েছিল ।

১০-৯-৪৬ এ পুলিশের কাছে জমা দেওয়া একটি অভিযোগে দেখা যায় যে গোলাম সরোয়ারের নেতৃত্বে মুসলীমলীগের একটি মিছিল সাম্প্রদায়িক স্লোগান দিয়ে গ্রাম পরিক্রমা করবার পর জনৈক গ্রামবাসীর দেবস্থান অপবিত্র করে । এভাবে একদিকে যখন লাগাতার ত্রাসের সৃষ্টি করে হিন্দুদের মনস্তাত্বিকভাবে ধ্বংস করার চক্রান্ত চলছিল, অন্যদিকে তখন মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তোলা হচ্ছিল ধর্মীয় কুসংস্কারকে সম্বল করে । মৌলভিরা গ্রামেগঞ্জে এমনও প্রচার করেছিল যে, আগামী কিছুদিনের মধ্যেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে এবং এই পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে সমস্ত হিন্দুকে মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে হবে ।

দাঙ্গার পরিকল্পনা এত ব্যাপক ছিল যে বাংলার বাইরে থেকে অবাঙালী পাঠান ও পেশোয়ারী মুসলমানদের এনে নোয়াখালির বিভিন্ন গ্রামে জড়ো করা হয়েছিল । অমৃতবাজার পত্রিকায় রিপোর্ট করা হয়েছিল, “Many of the hooligans in Noakhali appeared to be from outside.”

নোয়াখালি থেকে সর্বস্বান্ত হয়ে পালিয়ে আসা যে মানুষগুলি সেদিন কলকাতার বঙ্গ বাসী কলেজের ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদেরই একজন জনৈক ফণিভূষণ শূর জানিয়েছিলেন,

“আমাদের গ্রামে (হাজিগঞ্জ) দাঙ্গার নেতৃত্ব দিয়েছে পেশোয়ারী মুসলমানরা । ওদের প্রত্যেকের হাতে ছিল লম্বা তরোয়াল। ওদের নির্দেশেই খুন, লুঠ, ধর্ষণ, অপহরণ সংগঠিত হয়েছিল ।”

এখানেই শেষ নয় । দাঙ্গার এই নিখুঁত পরিকল্পনাকে আরো নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত করবার উদ্দেশ্যে নোয়াখালির দাঙ্গা পরিচালনার সমস্ত দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মুসলমান সৈন্যদের উপর । সেনাবাহিনীর রণকৌশলের সমস্ত শিক্ষা নোয়াখালির হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। লীগ নেতারা কলকাতা দাঙ্গার চরম প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন । তাই তাঁদের তৃনীরের সমস্ত অস্ত্রই তাঁরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে চাইলেন । দাঙ্গা বিধ্বস্ত নোয়াখালি ঘুরে এসে সাংবাদিকরা জানিয়েছিলেন,

“the heads of miscreants were Ex-servicemen and they organised the raids in military fashion…The people knew how to dig up road and cut communication.”

অর্থাৎ পেশাদারিত্বের সার্থক প্রয়োগ করা হল নোয়াখালির দাঙ্গায় । পথের জায়গায় জায়গায় গর্ত খুঁড়ে, কিংবা খাল এবং নদীগুলিতে নৌকার সাহায্যে ব্যারিকেড তৈরী করে আক্রান্ত হিন্দুদের পালিয়ে যাওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল । ‘হিন্দুরা যেন পালিয়ে যেতে না পারে তাই রাস্তাগুলি খুঁড়ে রাখা হয়েছিল, জলপথে ব্যারিকেড গড়ে তোলা হয়েছিল, এবং যেসব জায়গা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ রয়েছে, সেখানে সশস্ত্র দুস্কৃতিকারীরা পাহারা দিচ্ছিল ।’”

বাংলার লীগ মন্ত্রীসভার প্রধান সুরাবাদী স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন, “Some canals in the affected areas had been damaged and roads cut.” এভাবে সমস্ত প্রস্তুতি নেওয়ার পর, ১০ই অক্টোবর, ১৯৪৬, নোয়াখালি দাঙ্গার আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটল । ভয়াবহ সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হল হিন্দুদের উপর । নোয়াখালি ও ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খুন, লুঠ, ধর্ষণ ও অপহরণ চলল বাধাহীনভাবে । প্রশাসন জেগে ঘুমিয়ে রইল । অসহায় আতঙ্কিত হিন্দুরা পালাতে শুরু করল প্রাণ বাঁচাতে। দাঁঙ্গা শুরু হয়েছিল ১০ই অক্টোবর । কিন্তু রাজ্য সরকার দাঙ্গার খবর প্রথম প্রকাশ করল ১৫ই অক্টোবর । অর্থাৎ, দাঙ্গা শুরু হওয়ার পাঁচ দিন পরে, এবং সেটাও যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত আকারে । ‘নোয়াখালি দাঙ্গা’ সম্পর্কে স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রাথমিক রিপোর্ট লেখা হল,

“বাংলা সরকার প্রাথমিক খবরে জানতে পেরেছে যে নোয়াখালি জেলার দাঙ্গা শুরু হয়েছে । দাঙ্গাকারীরা মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গ্রাম আক্রমণ করছে । গত বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ ‘১০ই অক্টোবর থেকে এই খুন ও লুঠ শুরু হয় । জোর করে ধর্মান্তরকরণ এবং ধর্মীয় স্থান অপবিত্র করবার খবরও এসে পৌঁচেছে । ব্যাপক হত্যালীলা চলছে । জীবন্ত মানুষকেও পুড়িয়ে মারা হয়েছে । জেলার বার কাউন্সিলের সভাপতি ও তাঁর পরিবারের সবাইকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে ।”

সরকারের এই খবর black out করবার নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অমৃতবাজার পত্রিকায় সম্পাদকীয় লেখা হল,

“নোয়াখালি থেকে রক্ত হিম করা খবর আমাদের দপ্তরে এসে পৌঁচেছে । সরকারী ও বেসরকারী উভয়ের বক্তব্য থেকেই এটা পরিস্কার যে, এই দাঙ্গা ছিল পূর্বপরিকল্পিত । পরিকল্পনা অনুসারেই গত বৃহস্পতিবার থেকে খুন ও লুঠ শুরু হয়েছে ।

কিন্তু এটা ভাবতে অবাক লাগছে যে, এই ধরনের এক অভূতপূর্ব দাঙ্গার খবর প্রথম প্রকাশিত হল পনেরই অক্টোবর, অর্থাৎ দাঙ্গা শুরু হওয়ার পাঁচদিন পরে । দুঃখজনকভাবে, অথবা বলা যেতে পারে রহস্যজনকভাবে, বাংলা সরকারের ‘Director of Publicity’দ্বারা প্রকাশিত ‘press note’ এত সংক্ষিপ্ত (Laconic) ছিল যে এর থেকে কোনভাবেই দাঙ্গার ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করা সম্ভব নয় । “কিন্তু এই দীর্ঘ পাঁচদিন এভাবে সাধারণ মানুষকে অন্ধকারের রাখবার কৈফিয়ৎ কে দেবে? আর যাই হোক, নোয়াখালি নিশ্চয়ই পেশোয়ার বা কুইট্টা নয় । কলকাতা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ । তবে কি রাজ্য সরকার জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে এই ক’দিন কোন সংবাদ পায়নি । এবং যদি পেয়ে থাকে তবে রাজ্য সরকার এই ক’দিন কী করেছে?

শুধু খুন বা লুঠ ‘নোয়াখালি দাঙ্গা’র মূল উদ্দেশ্য ছিল না । তাই যদি হত তবে দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে মোল্লা বা মৌলভির দল হিন্দু গ্রামগুলি আক্রমণ করতে যেত না । এ ছিল ভবিষ্যৎ পাকিস্তান রাষ্ট্রের রূপরেখা কী হবে তার একটা ছোট্ট প্রদর্শন ।

জেলার সমস্ত হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করে নোয়াখালিকে দার-উল্-ইসলামে পরিণত করতে চেয়েছিলেন লীগের নেতৃবৃন্দ । তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল এই বল্গাহীন সন্ত্রাসের । তৎকালীন বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য কংগ্রেস নেতা কামিনী কুমার দত্ত ‘নোয়াখালি দাঙ্গা’র উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন,

“that the apparent object behind the disturbances was to make the entire district exclusive to the majority community (Muslim)

নোয়াখালিকে ‘দার-উল-ইসলামে’ পরিণত করবার জন্য সেখানে একদিকে যেমন খুনলুঠ-সন্ত্রাসের বল্লাহীন রাজত্ব কায়েম করা হল, অন্যদিকে তেমনি বারো থেকে বিয়াল্লিশ অসংখ্য হিন্দু নারী ধর্ষণ বা অপহরণের শিকার হল । ভাগ্যবতী যে ক’জন পালিয়ে আসতে পেরেছিল তাদের চোখেও ছিল মৃত্যুর বিভীষিকা । ‘হয় কোরাণ নয় মৃত্যু’ নীতি অবলম্বন করে হিন্দুদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হল । এমনকি, তাদের দিয়ে গো-হত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং সেই গোমাংস তাদের খাওয়ানো হল । হিন্দুদের সমস্ত ধর্মীয় স্থানগুলি অপবিত্র করাহল ।

কিন্তু পুলিশ ও প্রশাসন হিন্দু জনসাধারণকে রক্ষা করতে কী ব্যবস্থা নিয়েছিল? ঐ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল যে, নোয়াখালির জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট ঐ বর্বরতা বন্ধ করতে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি । অবশ্য পুলিশের সদর্থক ভূমিকা পালন করবার কোন প্রশ্নই ছিল না। নোয়াখালি জেলার পুলিশ প্রধান নিজে ছিলেন মুসলীম লীগের পরিকল্পিত এই দাঙ্গার প্রত্যক্ষ মদতদাতা । তাঁর হিন্দুবিদ্বেষ এত প্রবল ছিল এবং মুসলমান দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে তিনি এত বেশী ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন যে পুলিশের বিভাগীয় প্রধান তাঁকে ভর্ৎসনা করতে বাধ্য হয়েছিলেন । রাইটার্সবিল্ডিং থেকেও জেলা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল দাঙ্গার সাথে জড়িত হওয়ার অপরাধে যে সমস্ত লীগ সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাদের যেন ছেড়ে দেওয়া হয় । গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল যে,

সমগ্র নোয়াখালি জেলাকে ‘দার-উল-ইসলাম’-এ পরিণত করতে প্রয়োজন ছিল হিন্দু সমাজের শিরদাঁড়াটা ভেঙে দেওয়া । তাই দাঙ্গাকারীরা প্রথমে তাঁদের উপরই আঘাত হানল ‘যাঁরা সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে হিন্দু সমাজের অগ্রগণ্য ।

ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সন্ন্যাসী স্বামী ত্র্যম্বকানন্দ তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা যেভাবে বর্ণনা করেছিলেন তা এরকম-

“১০ই অক্টোবর বেগমগঞ্জ বাজার এলাকায় মুসলীম লীগের একটি সভা চলছিল । সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন গোলাম সরোয়ার । সভায় প্রায় পনেরো হাজার শ্রোতার সামনে তিনি তীব্র হিন্দু বিদ্বেষী বক্তব্য রাখেন । সেখানে থানার দারোগা নিজে উপস্থিত ছিলেন । কিন্তু তাঁর সামনেই এসব চলতে থাকে। সভা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তেজিত জনতা বাজারে হিন্দু দোকানগুলি আক্রমণ করে । লুঠ করবার পর সেগুলিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় । এরপর জনতা আলাদা আলাদা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে তিনদিকে ছড়িয়ে পড়ে ।

“এমনই একটি দল স্থানীয় জমিদার সুরেন্দ্র কুমার বোসের বাড়ি আক্রমণ করে । তাঁকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় । এরপর জনতা সুরেন্দ্রবাবুর কাছারি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় । সেই সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে পালিয়ে আসা অনেক হিন্দুনারী ও শিশু ঐ কাছারি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল । তাদের অনেকেই আগুনে জ্যান্ত দগ্ধ হয়ে মারা যায় । যারা কোনোক্রমে এই জতুগৃহ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল, তাদেরও কুপিয়ে হত্যা করা হয় ।

“অপর একটি দল নোয়াখালির District Bar-এর সভাপতি রাজেন্দ্রলাল রায়ের বাড়ি (করপাড়া গ্রাম) আক্রমণ করে । কিন্তু সেখানে স্থানীয় হিন্দুরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করলে দাঙ্গাকারীরা পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয় । বাধা পেয়ে ওরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং আশেপাশের হিন্দুগ্রামগুলিতে আক্রমণ চালায় । হিন্দুদের দেবস্থানগুলির পবিত্রতা নষ্ট করে । ইতিমধ্যে রাজেন্দ্রলাল রায় বেগমগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ জানান এবং দ্রুত পুলিশী নিরাপত্তা দাবী করেন । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ প্রশাসনিক কোন সাহায্যই তিনি পাননি ।”

“পরদিন সকাল আটটায় এক বিরাট জনতা মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাজেন্দ্রলাল রায়ের বাড়ি আক্রমণ করে । কিন্তু রাজেন্দ্রবাবু গুলি চালিয়ে আক্রমণকারীদের হটিয়ে দেন । এভাবে পর পর তিনবার দাঙ্গাকারীরা পিছু হটে যেতে বাধ্য হলেও চতুর্থবার তারা সফল হয় । মুসলীম লীগের প্রাক্তন এম. এল. এ. গোলাম সরোয়ারের নির্দেশে আক্রমণকারীরা প্রথমেই রাজেন্দ্রলাল রায়কে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে । এরপর তাঁর পরিবারের সবাইকে এবং সবশেষেতাঁর বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের হত্যা করা হয় ।”

নোয়াখালী দাঙ্গার ভয়াবহতা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয় যে ভারতীয় মুসলিমদের একাংশের মানসিকতা কেবলমাত্র সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও হিংস্রতায় গঠিত ছিল । তাদের হাতে ধর্ম ছিল কেবল ধ্বংসযজ্ঞের অজুহাত, মানবতা নয় । নারী ধর্ষণ, মন্দির ভাঙচুর, হিন্দুদের জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করানো । এসব তাদের অন্তর্নিহিত আসুরিক মনস্তত্ত্বের নগ্ন প্রকাশ । সত্যিই, এই দাঙ্গা প্রমাণ করেছে যে যখন ধর্মান্ধতা অন্ধ উন্মাদনায় রূপ নেয়, তখন মানুষ পশুকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে নিষ্ঠুরতায় ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

বিশেষ প্রতিনিধি

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।