আড়ম্বরপূর্ণ দূর্গাপুজো, হিন্দুদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় মহোৎসব

আড়ম্বরপূর্ণ দূর্গাপুজো, হিন্দুদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় মহোৎসব

বছর ঘুরে এসেছে দূর্গাপুজো। বাঙালি হিন্দুদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় মহোৎসব। শুধুমাত্র বাঙালি হিন্দুদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় মহোৎসব এ কথা বললে বোধ করি দূর্গাপুজোকে খানিকটা সংকীর্ণতার চাদরে মুড়ে দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে, দূর্গাপুজো শুধুমাত্র বাঙালি হিন্দুর সর্ববৃহৎ ধর্মীয় মহোৎসব নয়, বরং বিশ্বের ১৩০ কোটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় মহোৎসব।

 

পৃথিবীর সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মা দূর্গার পূজা করেন। তবে স্থান, কাল, পাত্র ভেদে জগজ্জননী মায়ের আরাধনার পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। কোথাও পুরো দেবীপক্ষ জুড়ে চলে মাতৃ আরাধনা, কোথাও আবার দেবীপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী অবধি মায়ের পূজার্চনা চলে। আমরা বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর হিন্দুরা মা দূর্গার পূজার্চনা করি ষষ্ঠী থেকে দশমী অবধি। এছাড়া ভারতবর্ষের অন্যান্য বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর লোকজন মাতৃ আরাধনা করে পুরো দেবীপক্ষ জুড়েই। তাঁরা মা দূর্গার নয়টি রূপের পুজো করেন নবরাত্রিতে; কেউ প্রতিমাতে, কেউ ঘটে। আঞ্চলিকতা ভেদে পূজা পদ্ধতি বা ধরন ভিন্ন হলেও মা দূর্গার পূজা করে সবাই বহু আকাঙ্খিত ভাবে; ভক্তিভরে পৃথিবীর সকল হিন্দুরা। পুরো বিশ্বব্যাপী দুটো ধর্মীয় উৎসব সর্বাত্মক সার্বজনীনতায় পালন করতে দেখা যায়-দূর্গাপুজো/নবরাত্রি এবং মহা শিবরাত্রি।

 

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আরো অসংখ্য ধর্মীয় আচার উৎসব পালন করলেও এতো অধিক সর্বব্যাপকতা সেখানে লক্ষ্যণীয় নয়। যেমন-রামনবমী উত্তর ভারতে ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও পৃথিবীর সকল হিন্দুদের সেভাবে ঔৎসুক্য দেখা যায় না। তেমনি শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী, বৃন্দাবন সহ উত্তর ভারতের কিছু অংশে, গুজরাট এবং নবদ্বীপ সহ বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে বেশ খানিকটা সর্বজনীন আমেজে ঔৎসুক্য দেখা গেলেও পুরো বিশ্বব্যাপী সকল হিন্দুদের আঙ্গিকে সর্বজনীন আমেজ পায়নি। তদ্রূপ, গণেশ পূজা বোম্বে সহ বিভিন্ন জায়গায় আড়ম্বরে উদযাপিত হলেও সার্বিক বিবেচনায় সমগ্র ১৩০ কোটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীর আঙ্গিকে সর্বজনীন বলা চলে না।

 

সচ্চিদানন্দ, পরাশক্তি মাতৃরূপে পূজিত হচ্ছেন অনাদিকাল হতেই। দেবীভাগবতে উল্লেখ রয়েছে-

 

‘সেয়ং শক্তির্মহামায়া সচ্চিদানন্দরূপিণী।

রূপং বিবর্তরূপা চ ভক্তানুগ্রহহেতবে।।’

 

সেই সচ্চিদানন্দরূপিণী মহামায়া পরাশক্তি অরূপা হইয়াও ভক্তগণকে কৃপা করিবার জন্য রূপ ধারণ করেন। মৃন্ময়ী প্রতিমাতে সেই পরম চিন্ময়ী সত্ত্বা আমাদের মাঝে এসেছেন। বিশ্ব জেগে উঠেছে তাঁর বন্দনায়।

 

বিদ্যুৎ অদৃশ্যমান, কিন্তু বালব দৃশ্যমান। সুইচ টিপ দিলেই বাল্বটি জ্বলে ওঠে। বিদ্যুৎ না থাকলে বাল্ব কার্যকারিতাহীন, মূল্যহীন হয়ে যায়। তদ্রুপ, শাস্ত্রজ্ঞ পূজারি পবিত্র হৃদয়ে বেদমন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে মৃন্ময়ী প্রতিমাতে বিদ্যুৎ সংযোগের মতোই সচ্চিদানন্দ, অরূপিণী পরাশক্তিকে সংযুক্ত করেন। মাটির প্রতিমা হয়ে যায় সচ্চিদানন্দময়ী। অশ্রু অঞ্জলিতে ভক্তকূল মায়ের চিন্ময়ী প্রতিমাতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষের প্রার্থনা জানান। বিশ্বেশ্বরী মাতা

পরম পবিত্র বেদে বলেছেন-

 

“অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসূনাং

চিকিতুষী প্রথমা যাজ্ঞিয়ানাম।

তাং মা দেবা ব্যদধুঃ পুরুত্রা

ভূরিস্থাত্রাং ভূর্যা বেশয়ন্তীম্।”

 

আমি সমগ্র জগতের ঈশ্বর, উপাসকগণের ধনদাত্রী, পরব্রহ্ম আমার আত্মাস্বরূপ এবং অভিন্ন। সর্ব যজ্ঞের প্রধান পূজিতা। আমার সৃষ্ট দেবগণ আমাকে বহু স্থানে বহু রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং আমি সর্বজীবে জীবাত্মারূপে প্রবিষ্ট হয়ে আছি।

 

“অহমেব স্বয়মিদং বদামি জুষ্টং

দেবেভিরুত মানুষেভিঃ।

যং যং কাময়ে তং তমুগ্রং কৃণোমি

তং ব্রহ্মাণং তমৃষিং তং সুমেধাম্।”

 

দেবতা ও মনুষ্যগণের পরম আকাঙ্খিত ব্রহ্মতত্ত্ব আমি স্বয়ং প্রকাশ করছি। আমি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যাকে ইচ্ছা তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ করি, তাঁকেই গৌণ সৃষ্টিকর্তা করি (ব্রহ্মা), তাঁকেই গৌণ পালনকর্তা করি (বিষ্ণু), তাঁকেই গৌণ ধ্বংসকারী করি (সংহারী রুদ্র), তাঁকেই তত্ত্বদ্রষ্টা ঋষি করি এবং তাকেই উত্তম বুদ্ধিমান ও প্রজ্ঞাবান করে তুলি।

 

অভয়প্রদায়িনী মা বেদে অনুরণিত তাঁর বাণী সর্বদা নিত্য রূপে প্রয়োগ করেন, তার উদাহরণস্বরূপ মহাভারতের ভীষ্ম পর্বের ২৩-তম অধ্যায়ের প্রতি দৃষ্টিপাত প্রণিধানযোগ্য। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নারায়ণের অবতার শ্রীকৃষ্ণ সারথি হয়ে বসে আছে বন্ধু অর্জুনের রথে। মানবরূপে জন্মগ্রহণকারী শ্রেষ্ঠ পুরুষ, শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, শ্রেষ্ঠ লীলা অবতার, মহাশক্তিশালী শ্রীকৃষ্ণ উপলব্ধি করলেন যে যুদ্ধে ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণের মতো যোদ্ধা বিরুদ্ধ শিবিরে উপস্থিত, সেই যুদ্ধে অর্জুনের জয় একমাত্র পরমতত্ত্ব, পরাশক্তির বরলাভ ভিন্ন কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই তিনি বন্ধু অর্জুনকে পরমতত্ত্ব মহামায়াকে প্রার্থনা করে তাঁর বরলাভের আহ্বান জানান। বিশুদ্ধ চিত্তে অর্জুন আদিশক্তি মহামায়াকে অশ্রু অঞ্জলিতে প্রার্থনা শুরু করলেন এবং আকাশবাণীতে বর লাভ করলেন। আকাশবাণী হলো- হে বৎস, দ্রুতই তুমি শত্রুর ওপর বিজয় লাভ করবে। তুমি ভয় পেও না-তোমার সারথী রূপে রয়েছেন আমার অতীব প্রিয় নারায়ণ। এবার, শ্রীকৃষ্ণ পূর্ণরূপে নিশ্চিত হলেন এই ধর্মযুদ্ধে অর্জুনের পক্ষই বিজয়ী হবে। আমাদের অন্যতম জনপ্রিয় স্মৃতি শাস্ত্র মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ এবার ঘোষণা করলেন-হে অর্জুন, তুমিই জিতবে, দিলেন পরম ও চরম আত্মবিশ্বাসী বাণী-তুমি দেখ আমি সকলকে ইতিমধ্যেই মেরে ফেলেছি, তুমি শুধু যুদ্ধ করো, ত্রিদেব এর অভেদতত্ত্ব ধারণে ঘোষণা করলেন পরম অভয় বাণী। শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে নিঃসৃত হলো দর্শন শাস্ত্রের মহাজ্ঞান, এই তত্ত্বের গভীরতা এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল যে আমাদের অত্যন্ত প্রিয় স্মৃতিশাস্ত্র মহাভারতের ভীষ্মপর্ব থেকে স্বতন্ত্র স্মৃতি শাস্ত্র হিসেবে আজ নিত্য পাঠ্য-গীতা হয়েছে। একইভাবে, মহাভারতের বিরাটপর্বে অজ্ঞাতবাসের সাফল্যার্থে যুধিষ্ঠিরও জগন্মাতা দূর্গাদেবীর স্তব করেন।

 

সেই ব্রহ্মময়ী মাতা যিনি নিরাকার, আবার মহাবিশ্বই যাঁর পরিদৃশ্যমানরূপ, তিনি মৃন্ময়ী প্রতিমাতে ভক্তবৃন্দের পূজা গ্রহণ করতে নশ্বর ধরাতে এসেছেন। শ্রীচণ্ডীতে আমরা দেখতে পাই, শরৎকালেই সুরথ এবং সমাধি বহু মনু পূর্বে মায়ের মৃন্ময়ী পূজা করেছেন(শ্লোক ১২, অধ্যায় ১২; শ্রীচণ্ডী)। দেবীভাগবতেও শরৎকালেই মৃন্ময়ী মায়ের পূজা শুরুর বর্ণনা রয়েছে। পুরুষোত্তম রাম, মহাজ্ঞানী অসুর রাবন এবং বীর মেঘনাদকেও আমরা শরৎকালেই মাতৃ আরাধনা করতে দেখি। কৃত্তিবাস অবশ্য শরৎকালে মাতৃ আরাধনাকে পৌরাণিক তথ্যে অকালবোধন বলেছেন, তবে সেই আদর্শ, শ্রীচণ্ডী এবং দেবীভাগবতের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। বরং, বছরের দুটো প্রধান দূর্গাপুজোর উল্লেখ শাস্ত্রে অধিক তাৎপর্য বহন করে।

 

বছর ঘুরে এসেছে ব্রহ্মস্বরূপা ও সর্ব বেদান্ততাৎপর্যভূমি, বিশ্বপ্রসবিনী মা। পিতৃপক্ষের মাটির খড়কুটোরর মা আজ চিন্ময়ী। ভক্তি ভরে অশ্রু অঞ্জলিতে তাঁর কৃপাপ্রাপ্তির অমোঘ ক্ষণ এখন। আত্মজিজ্ঞাসু পণ্ডিত শাস্ত্র পর্যালোচনা করবেন, কারণ হিন্দুধর্ম জ্ঞান এবং ভক্তির সমন্বয়ে চলে। তবে, ভক্তের সরলতাপূর্ণ ভক্তি আর অশ্রু অঞ্জলিতে যা কিছু অর্জন সম্ভব, তা অন্য কিছুতেই অর্জন সম্ভব নয়। তাই চলুন-ভক্তিভরে মায়ের কাছে যাই, অশ্রু অঞ্জলিতে প্রার্থনা করি-আমাদের সকলের হৃদয়ের আসুরিক প্রবৃত্তি বিনাশ হোক, অসুরদের কবল থেকে সুর-নরদের মা রক্ষা করুন, সকলের কল্যাণ সাধন করুন মা। প্রণাম হে পরমতত্ত্ব, আদিশক্তি ভুবনেশ্বরী মাতা।

 

ডক্টর সুদীপ চন্দ্র হালদার

কবি এবং গবেষক।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

ডক্টর সুদীপ চন্দ্র হালদার

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।