আমেরিকার শিকাগোয় হিন্দু মন্দিরে উগ্রপন্থীর নৃশংস হামলা ষড়যন্ত্র ও তার ব্যর্থতা: একটি বিশদ পর্যালোচনা

আমেরিকার শিকাগোয় হিন্দু মন্দিরে উগ্রপন্থীর নৃশংস হামলা ষড়যন্ত্র ও তার ব্যর্থতা: একটি বিশদ পর্যালোচনা

আমেরিকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়ে চলা উগ্র ডানপন্থী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসী মানসিকতার শিকার হতে চলেছিল শিকাগো সংলগ্ন অরোরা এলাকার একটি বৃহৎ হিন্দু মন্দির। ১৯ বছর বয়সী এক শ্বেতাঙ্গ উগ্রপন্থীর নিখুঁত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং এক সহকর্মীর সাহসিকতায় ভেস্তে যায়।

১. ঘটনার সূত্রপাত ও মূল ষড়যন্ত্র

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যালাটাইন শহরের বাসিন্দা ১৯ বছর বয়সী আলেকজান্দ্রোস পাপোরাকিস (Alexandros Paporakis) দীর্ঘদিন ধরে একটি ভয়াবহ হামলার পরিকল্পনা করছিল। প্রসিকিউটর ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সে প্রায় দুই বছর ধরে এই হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং গুগল স্ট্রিট ভিউ ও ইউটিউব ব্যবহার করে তার টার্গেট রেকি করেছিল।

নবরাত্রির উৎসব চলাকালীন অরোরা শহরের শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী (বালাজি) মন্দিরে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটেছিল। ওই দিন ঘটনাচক্রে মার্কিন কংগ্রেসম্যান রাজা কৃষ্ণমূর্তি সপরিবারে মন্দিরের ভেতরে উপস্থিত ছিলেন। পাপোরাকিস গাড়ি নিয়ে মন্দিরের পার্কিংয়ে প্রবেশ করে এবং সেখানে বন্দুক দিয়ে হামলার চেষ্টা চালায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার ব্যবহৃত এআর-স্টাইল রাইফেলটি জ্যাম (অচল) হয়ে যাওয়ায় সে বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটাতে ব্যর্থ হয়।

২. সহকর্মীর সতর্কতা ও নাটকীয় গ্রেপ্তার

মন্দির থেকে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার পর পাপোরাকিস তার কর্মক্ষেত্রের এক সহকর্মীকে পুরো ঘটনাটি জানায় এবং অস্ত্রটি অচল হয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ও বার্তা পাঠায়। সে এও জানায় যে সে অস্ত্র মেরামত করে পুনরায় হামলা চালাতে চায়।

* তার উগ্র আচরণ ও খুনের অভিপ্রায় দেখে শঙ্কিত হয়ে ওই সহকর্মী তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে খবর দেন।

* প্যালাটাইন পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ও এফবিআই (FBI)-এর যৌথ দ্রুত পদক্ষেপে রবিবার বিকেলে তার বাসভবনের বাইরে থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

* তার বাসা তল্লাশি করে একটি সিরিয়াল নম্বরবিহীন এআর-স্টাইল রাইফেল, প্রায় ৩০০ রাউন্ড গুলি, পরিধেয় ট্যাকটিক্যাল ভেস্ট ও বডি আর্মার, নাৎসি প্রতীক সংবলিত সামগ্রী এবং দক্ষিণ এশীয়দের নিয়ে অকথ্য গালি লেখা গ্যাস ক্যানিস্টার উদ্ধার করা হয়।

৩. বর্ণবিদ্বেষী ইশতেহার: “Why I Fought”

তদন্তকারীরা পাপোরাকিসের কাছ থেকে “Why I Fought: A.K.A. (Aurora Shooter’s Manifesto)” শিরোনামের আট পাতার একটি ঘৃণা ও উসকানিমূলক ইশতেহার উদ্ধার করেন।

* ওই নথিতে সে নিজেকে একজন ‘সোমাটিক শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী নিও-নাৎসি’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছে, যে প্রতিদিন গণহত্যাকান্ডের স্বপ্ন দেখত।

* এতে দক্ষিণ এশীয় (বিশেষ করে ভারতীয় ও হিন্দু বংশোদ্ভূত), কৃষ্ণাঙ্গ ও ইহুদি সম্প্রদায়কে অবমাননাকর ভাষায় “অমানুষ” (Subhumans) বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং যত বেশি সম্ভব মানুষকে নিধন করার উন্মাদনা প্রকাশ পেয়েছে।

৪. আইনি পদক্ষেপ ও বিচার প্রক্রিয়া

আলেকজান্দ্রোস পাপোরাকিসের বিরুদ্ধে আদালতে গুরুতর অভিযোগ গঠন করা হয়েছে:

* তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী হুমকি প্রদান (Making a terrorist threat – Class X felony) এবং অবৈধভাবে সংক্ষিপ্ত ব্যারেলের রাইফেল রাখার মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

* বিচারক তাকে জামিনঅযোগ্য ঘোষণা করে সরাসরি কারাবন্দী রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

৫. সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

* অভিবাসী ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা শঙ্কা: এই ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। মন্দিরগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।

* শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদের উত্থান: বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সমাজে জনসংখ্যার পরিবর্তন ও অভিবাসন বিরোধী ডানপন্থী প্রোপাগান্ডা কীভাবে তরুণ প্রজন্মকে উগ্র নাৎসি আদর্শের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, এই ঘটনা তারই এক ভয়াবহ প্রমাণ।

* নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া: কংগ্রেসম্যান রাজা কৃষ্ণমূর্তি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন যে, শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদ এবং ভারত-বিরোধী ঘৃণার বিষ যেভাবে শিকড় গাড়ছে, তা রোধ করতে প্রশাসনকে আরও কঠোর ও সতর্ক হতে হবে।

এই ঘটনা প্রমাণ করে যে উন্নত বিশ্বে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও উচ্চ সামাজিক মর্যাদা অর্জন করলেও সংখ্যালঘুরা অনেক সময়ই বর্ণবাদী ও উগ্র মানসিকতার অন্ধ আক্রোশ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে না।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
সংবাদ প্রতিনিধি

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।